ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
355
চার দশকে কুমিল্লার রাজনীতি
Published : Thursday, 15 December, 2016 at 3:00 PM, Update: 08.09.2019 3:18:24 PM

চার দশকে কুমিল্লার রাজনীতিআহসানুল কবীর।
মোটাদাগে রাজনীতি মানে রাজার নীতি। যদিও বর্তমানে রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন জনতাই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস। জনতাকে আমরা যতই সকল ক্ষমতার আধার হিসাবে চিহ্নিত করিনা কেন আসলে প্রকৃত অর্থে জনগণ কতটুকু ক্ষমতাবান তা আমরা সবাই কমবেশি জানি বৈকি। তাই আমরা রাজনীতিকে চিহ্নিত করতে পারি রাষ্ট্রনীতি বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার নীতি হিসাবে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, জনগণ, সবাই এর অন্তর্ভুক্ত। যদিও আমরা বলে থাকি মানুষের জন্ম থেকেই রাজনীতির উৎপত্তি। তথাপিও বর্তমানের যে বিধিবদ্ধ রাজনীতি তার উদ্ভব কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে প-িত ব্যক্তিরা বলেছেন, আমরা যাকে রাষ্ট্রচিন্তা বা রাজনৈতিক মতবাদ বলি তার জন্ম মূলত প্রাচীন গ্রীসে। ভারতবর্ষ, চীন ও মিশরে প্রাচীন কালে রাষ্ট্রচিন্তার অস্তিত্ব থাকলেও আধুনিককালে যাকে রাষ্ট্রচিন্তা বলা হয় তা সে সমস্ত দেশে ছিলো না। এ সমস্ত দেশে সরকার মূলত ছিল রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক। ব্যক্তি স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কগুলো মূলত তখন ক্রিয়াশীল ছিলোনা। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক চিন্তা মূলত স্বৈরতান্ত্রিক রাজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। পক্ষান্তরে এ  বিষয়গুলো প্রাচীন গ্রীসে আজ থেকে ২৫০০ বছর পূর্বে দৃশ্যমান ছিলোনা। প্রাচীন গ্রীসের সমাজ ব্যবস্থায় ও রাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রেণির অধিকার হওয়ায় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। মূলত রাষ্ট্র হচ্ছে কোন উত্তম উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মানুষের সমবায়ে গঠিত একটি সংগঠন। যদিও মার্কসবাদীরা মনে করেন শোষণের হাতিয়ার হিসাবে রাষ্ট্র ব্যবস্থার উদ্ভব। রাষ্ট্রের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রনীতির প্রয়োজনীয়তাও অনুভূত হতে থাকে। তৎকালীন গ্রীক দার্শনিকরা ধর্ম সম্পর্কে নিস্পৃহ মনোভাব পোষণ করতেন ফলে রাজনীতি অনেকটাই স্বাধীনভাবে বিকশিত হবার সুযোগ লাভ করে।
সহজ কথায় রাজনীতি আসলে কি? নিজের মত করে যদি বলি তাহলে আমি বলব রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে উপযুক্ত পথে সঠিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি সমূহকে একত্রিত করে বিভিন্ন পলিসি নির্ধারণ করে এবং সেই কৌশল অনুযায়ী কর্মকা- পরিচালনার মাধ্যমে তাদের নীতি সমূহকে বাস্তবায়ন রতে চায়। ওয়ান ইলাভেন এর সময় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় ব্যারিস্টার মওদুদ রাজনীতির সংজ্ঞা দিয়েছেন এইভাবে- “রাজনীতি হল এক ধরনের ভাবাবেগ, অন্তর থেকে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে উঠে আসা এক ধরনের অভিব্যক্তি অন্যের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল হতে উদ্বেলিত হওয়ার একধরণের চালিকা শক্তি। রাজনীতি হল আমাদের চারপাশে বিরাজমান পরিস্থিতি, জনতাকে নিয়ে চিন্তা করার সহজাত প্রবণতা, জনগণের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে এমন সব সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার এক নৈর্ব্যত্তিক আত্মচিন্তা, রাজনীতি হল আত্মজিজ্ঞাসার এক অদৃশ্য আকাক্সক্ষা - ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের এক অনন্য সাধারণ অনুভূতির সংমিশ্রণ”। জনগণ বা জনগোষ্ঠী যেমন রাজনীতির মূল উপজীব্য বিষয় তেমনিভাবে রাজনৈতিক দল হচ্ছে রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি। সনাতন ভাবে যখন কতিপয় লোক অভিন্ন আদর্শের অধীনে সংঘবদ্ধ হয়ে সরকারি ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় সমস্যাবলী সমাধানে প্রয়াসী হয় তখন ঐ জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক দল নামে অবহিত করা হয়। ঐ জনগোষ্ঠী জাতীয় সমস্যা সম্পর্কে একই ধরনের মত পোষণ করে এবং নিজেদেরকে রাজনৈতিক ভাবে সংঘবদ্ধ করে নিজেদের কর্মসূচি ও মতাদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবিরাম প্রয়াস বজায় রাখে। রাজনৈতিক দল এমন কতগুলো লোকের সমষ্টি যারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মসূচির অধীনে একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যায়। জে.এস সুম্পিটার বলেন ‘রাজনৈতিক দল এমন একটি জনসংঘ যার সদস্যগণ রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন’। গেটেলের মতে ‘রাজনৈতিক দল কম বেশি সংগঠিত রাজনৈতিক গোষ্ঠি যারা রাজনৈতিক একক হিসাবে কাজ করে এবং যারা তাদের ভোটদান ক্ষমতা প্রয়োগ করে সরকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তাদের সাধারণ নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে চায়’। বর্তমানের যে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা তার ইতিহাস খুব একটা প্রাচীন নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে মাত্র গত শতাব্দীতে এর উদ্ভব হয়েছে। ইংল্যান্ডে ১৮৩২ সনের সংস্কার আইনে স্থানীয় নিবন্ধিত সমিতি গুলো রাজনৈতিক দলের মর্যাদা লাভ করে। ফ্রান্স এবং মহাদেশের অন্যান্য স্থানে ১৮৪৮ সালে আইনসভায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল এবং রাজনৈতিক সংঘগুলি জনমুখী সংগঠনের প্রকৃতি লাভ করে রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৭৯০ সালের দিকে কিছু কিছু রাজনৈতিক সংগঠনের তথ্য পাওয়া গেলেও কেবল মাত্র ১৮৩০ সালে এন্ড্রু জ্যাকসনের আমলে ব্যাপক জনভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়। এশিয়া মহাদেশের প্রম দেশ জাপানে ১৮৬৭ সনে আধুনিক অর্থে রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দল ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আধুনিককালে এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে রাজনৈতিক দল ছাড়া কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থা কল্পনা করা যায়না। কুমিল্লার রাজনীতির চারদশকের সালতামামি করতে গেলে একে কয়েকটি পর্যায়ে বিন্যস্ত করে নেয়া শ্রেয়তর হবে। যেমন স্বাধীনোত্তর সময় থেকে ১৯৭৫ সন পর্যন্ত রাজনীতির একটি পর্যায় আবার ৭৫ থেকে ৯০ এর স্বৈরাচারের পতন পর্যন্ত একটি স্তর এবং ৯১ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সর্বশেষ স্তর। সর্বশেষ স্তরটি একদিকে আশা জাগানিয়া অপরদিকে রাজনীতির অবক্ষয় আর স্খলনেরও সময়। ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ কুমিল্লা শহর হানাদার মুক্ত হয়। ডিস্ট্রিক এডমিনিস্ট্রেটর এড. আহম্মদ আলী কুমিল্লা টাউন হল মাঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। অবশ্য তখন পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত জেলা প্রশাসক নুরুন্নবী চৌধুরীও কর্মরত ছিলেন। পরে ১ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে কাজী রকিব উদ্দিনকে কুমিল্লার প্রথম জেলা প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। পাশাপাশি ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ মুজিবনগর সরকারে পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল আবদুল খালেকের নির্দেশে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত কুমিল্লার পুলিশ সুপার এস এম শাহাজাহানকে (পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) অপসারণ করে চিত্ত বিনোদ দাসকে কুমিল্লার পুলিশ সুপার হিসাবে নিয়োগ দান করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে কুমিল্লাতে মুজিবনগর সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্ত কুমিল্লার রাজনীতির শুরুটা আনন্দ আর বেদনার মিশ্র ইতিহাস। একদিকে সশ্রস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে পাক হানাদারদের বিতাড়িত করার আনন্দ, আরেকদিকে স্বজন হারানোর বেদনা আর নির্যাতিত হবার করুণ আর্তি। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এটিই স্বাভাবিক। আমরা যদি সদ্য স্বাধীন কুমিল্লার রাজনীতির দিকে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব নতুন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে, কর্তৃত্বের পরিবর্তন ঘটেছে, নেতৃত্বের পালাবদল হয়েছে ঠিকই কিন্তু রাজনৈতিক পদ্ধতি বা মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেনি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধটি রাশিয়ান বিপ্লবের ন্যায় সশস্ত্র বিপ্লব ছিলনা এটি ছিল সশস্ত্র গণ প্রতিরোধ। বঙ্গবন্ধু মহান জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন, বিপ্লবী ছিলেন না। এই অঞ্চলের অনেক নেতার মত বিপ্লবের নামে রোমান্টিসিজম তার উপর ভর করেনি। তিনি প্রচলিত পদ্ধতির মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। ফলে সদ্য স্বাধীন দেশে জনগনের আকাক্সক্ষার সাথে নেতৃত্বের মানসিকতার খাপ খাওয়ানো ছিল একটি কঠিন বিষয়। সদ্য স্বাধীন কুমিল্লাতে আওয়ামীলীগ নেতাদের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। কুমিল্লায় জামায়াত তেমন কোন প্রভাবশালী সংগঠন ছিলনা। মুসলিম লীগের শক্তিশালী সংগঠন না থাকলেও অর্থনৈতিক বুনিয়াদের কারণে তারা ছিল সমাজে প্রভাবশালী। কিন্তু যুদ্ধে পরাজয় কিংবা বিতর্কিত ভূমিকার কারণে তাদের অধিকাংশ ছিল আত্মগোপনে, কারাগারে কিংবা কোনঠাসা অবস্থায়। অতীন্দ্র মোহন রায়, কমরেড এয়াকুব, অধ্যাপক মোজফফর আহমেদ, ফয়েজুল্লার মত স্বনামধন্য বামপন্থী নেতাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যে মাত্রায় ছিল তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি সে পরিমাণে ছিলোনা। ফলে স্বাধীনোত্তর কুমিল্লায় ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদেরকে আওয়ামীলীগের প্রকৃত বিকল্প হিসাবে জনগণের সামনে উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। পক্ষান্তরে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত একটি সুশৃংখল জনদরদী দল হিসাবে পরিচালিত হলেও যুদ্ধের পরে অনেক অনুপ্রবেশকারী এ দলে ঢুকে পড়ে। যাদের নিকট জনকল্যাণের চেয়ে আত্মকল্যাণই মুখ্য ছিল। তবে তা বর্তমানের মত সর্বগ্রাসী বা সর্বব্যাপি ছিলনা। আবার আমাদের একথা ভুলে গেলেও চলবেনা যে আওয়ামীলীগ কোন ক্যাডার ভিত্তিক সুশৃংখল সংগঠন নয়। এটি পাতি বুর্জোয়াদের দল, মাল্টিকাশ অরগানাইজেশন আর মধ্যবিত্তের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সে ক্রমান্বয়ে উপরে আরোহন করতে চায়। নিজের প্রয়োজনে সে আপোষকামী। এটি আওয়ামীলীগের দোষ নয় তার শ্রেণি চরিত্রের দোষ। এজন্য আমরা দেখব এসময়ে কুমিল্লায় আওয়ামীলীগের নেতাদের অনেককেই গোপনে স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে আপোষ করেছেন, মাসোহারা নিয়েছেন।
সমাজবিরোধীদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি দলের অনেক নেতাকর্মী লাইসেন্স পারমিটের জন্য কাঙ্গাল ছিলেন। ফলে দেশ পুনর্গঠনের চেয়ে নিজের পুনর্বাসনের প্রতিই তাদের নজর ছিল প্রবল। ফলে জনমনে তৈরি হয় একধরনের হতাশা। এ হতাশার মাঝে দরকার ছিল একটি গঠনমূলক বিরোধীদলের। যা ছিল অনুপস্থিত। ফলে জনমনে হতাশা আরো গভীর হয়। এরই মাঝে আত্মপ্রকাশ করে জাসদ। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে প্রথম ছাত্রলীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়। তার ধারাবাহিকতায় মে মাসে কৃষক লীগ এবং জুন মাসে শ্রমিক লীগেও বিভক্তি আসে। সর্বশেষ ১৯৭২ সনের ৩১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক ভাবে জাসদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। কুমিল্লাতেও একই ভাঙ্গনের ঢেউ লাগে। কুমিল্লাতে এ ভাঙ্গনের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন সদ্য বিদায়ী এবং মাঠে সক্রিয় ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। জাতীয় রাজনীতিতে যেমন স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে শেখ ফজলুল হক মণি এবং সিরাজুল আলম খানের অনুসারী দু’টি সক্রিয় গ্রুপের উপস্থিতি ছিল। কুমিল্লাতেও তেমনি ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব থেকে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে দুটি গ্রুপ ছিল। একটি গ্রুপের অভিভাবক ছিলেন সৈয়দ রেজাউর রহমান অপরটির আফজল খান। কিন্তু তাদের সাথে তখনও ঢাকার গ্রুপিং যুক্ত হয়নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পরও না। তখন জেলা আওয়ামী লীগের মূল নেতৃবৃন্দ খন্দকার মোশতাক, জহিরুল কাইয়ুম, এডভোকেট সিরাজুল হক, মিজানুর রহমান চৌধুরী, এড. আহমদ আলী, অধ্যাপক খোরশেদ আলম, আজিজ খান প্রমুখ বিদ্যমান সকল পক্ষের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। আজকের আওয়ামীলীগ নেতাদের মতো তারা মুখ দেখাদেখি বন্ধ পর্যায়ে চলে যাননি। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণবিরোধ ১৯৬৯ থেকেই তুঙ্গে উঠে। তখন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনসার আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক দুলাল। অপর দিকে ৭০ এর নির্বাচনে ভিক্টোরিয়া কলেজের সহ সভাপতি নির্বাচিত হন নাজমুল হাসান পাখী সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী। তারা দু’জনেই সৈয়দ রেজাউর রহমানের অনুসারী। এ প্রসঙ্গে জহিরুল হক দুলাল বলেন, এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা ছিল আফজল গ্রুপ জেলা কমিটির নেতৃত্বে থাকলে রেজা গ্রুপ কলেজের নেতৃত্বে থাকবে।
এরই ধারাবাহিকতায় ৭০ এর মাঝামাঝি সময়ে সৈয়দ আবদুল্লাহ পিন্টুকে আহবায়ক এবং রুস্তম আলীকে সদস্য সচিব করে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি করা হয়। ইত্যবসরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের পরেও এই কমিটিই কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। এরই মাঝে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে বিভক্তি আসল। একদিকে শেখ শহীদ আর এম.এ রশীদের নেতৃত্বে মুজিববাদী ছাত্রলীগ আরেক দিকে শরীফ নুরুল আম্বিয়া আর শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে জাসদ ছাত্রলীগ। কুমিল্লাতেও সেই ঢেউ লাগল। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এবং তৎকালীন ছাত্রনেতা দীপক রায় বলেন “জেলা ছাত্রলীগের করণীয় নির্ধারণের জন্য আমরা চৌধুরী মার্কেটস্থ ছাত্রলীগ অফিসে সভায় বসলাম। অধিকাংশ উপস্থিতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পক্ষে মত প্রকাশ করলো। আমরা ১১ জন প্রতিবাদ করে বেরিয়ে আসলাম”। ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি নাজমুল হাসান পাখি বলেন, “চৌধুরী মার্কেটের অফিস থেকে বেরিয়ে এসে জিলা স্কুল রোডে নিউ মার্কেটের উল্টো দিকে আলাদা অফিস নিলাম। আমাকে আহবায়ক এবং রুস্তমকে সদস্য সচিব করে এডহক কমিটি করা হল। এই কমিটি টাউন হলে দু’দিনব্যাপি সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মিজান ভাই (মিজানুর রহমান চৌধুরী)। বিশেষ অতিথি মাহামুদুর রহমান বেলায়েত ও সৈয়দ রেজাউর রহমান। সম্মেলনে আমি সভাপতি হিসাবে রুস্তম আলী এবং সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আকবর কবিরের নাম ঘোষণা করি। আমাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ঘোষণা করা হয়। এ প্রসঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজের জিএস মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন ‘আমরা অধিকাংশ তরুণ তখন অপরিপক্ক বয়স, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রঙ্গিন স্বপ্নে বিভোর। শিব নারায়ণ দাশকে সভাপতি এবং কাজী গোলাম মইনুদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণার মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগের ভাঙ্গন প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে’। যদিও সৈয়দ আব্দুল্লাহ পিন্টু বলেন তাকে সভাপতি এবং শিব নারায়ণ দাশকে সাধারণ সম্পাদক করে জাসদ ছাত্রলীগের প্রথম কমিটি করা হয়। এই ভাঙ্গন পুরো জেলায় সর্বগ্রাসী রূপে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংগঠন দুই ভাগ হয়ে পড়ে। যারা এতোদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিল তারা পরস্পরের প্রতিপক্ষে রূপান্তরিত হল। এরই মাঝে ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ মনোনীত রুস্তম বশীর পরিষদকে হারিয়ে জাসদ ছাত্রলীগের শাহআলম মহিউদ্দিন বিজয়ী হন। এসময়ে জাসদের কমিটিও গঠিত হয়। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জাসদের কমিটি গঠনের জন্য শাহ আলম ভাইয়ের বাসায় আ স ম আবদুর রবের উপস্থিতিতে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। আরো কয়েকটি সভার পর ফজলু মোক্তার এবং আনছার ভাইকে যুগ্ম আহবায়ক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়’। আবদুল্লাহীল বাকি বলেন, ‘রশীদ ইঞ্জিনিয়ারকে সভাপতি এবং আনছার আহম্মেদকে সাধারণ সম্পাদক করে কুমিল্লায় জাসদের প্রম পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়’। এরই মাঝে ঘটে যায় একটি দুঃখজনক ঘটনা। ১৯৭৩ সনের প্রম দিকে রাজগঞ্জ ফল বাজারের সামনে বেলা ১১টার দিকে জাসদের একটি মিছিল হামলার শিকার হয়। হামলাকারীদের গুলিতে শরীফ নামে জাসদের এক কর্মী নিহত হন। এটিই স্বাধীনোত্তোর কুমিল্লার প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকা-। যদিও মহিউদ্দিন আহমেদ ওহাব নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন কিন্তু নাজমুল হাসান পাখি তা সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন।
ইতিহাসের নিরীখে জাসদের সৃষ্টি কতটুকু ভুল বা সঠিক ছিলো তা ইতিহাস একদিন নির্ধারণ করবে। তবে অনস্বীকার্য যে জাসদ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি আসল। জাসদের আড়ালে প্রতিক্রিয়াশীল স্বাধীনতা বিরোধী চক্র মাঠে নামার সুযোগ পেল। ’৭৫ এর পূর্বে জাসদের জনসভাগুলোতে ব্যাপক জনসমাগম হতো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জনসমাগম হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য জাসদের মতো একটি সংগঠনের প্রয়োজন ছিলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে জাসদ রাজনীতির উপযোগিতা হারিয়ে যায়। তৎকালীন ছাত্রনেতা জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘৭৪ এ রব ভাই (আ.স.ম আবদুর রব) টাউন হলে আসলে পুরো মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়, আশে পাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। অথচ এই রব ভাই যখন বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বরণের পর টাউন হল মিলনায়তনে আসলেন, মিলনায়তনের অর্ধেক আসন খালি ছিল’। শুধু তাই নয়, কুমিল্লা টাউনহল মাঠে দেলোওয়ার হোসেন সাঈদির প্রথম ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সনে। আঞ্জুমানে খেদমতে খাল্ক এর ব্যানারে আয়োজিত এন্তেজামিয়া কমিটির সভাপতি ছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী আবদুল ওয়াদুদ সদস্য সচিব ছিলেন একজন জাসদ নেতা। এভাবেই সচেতনভাবে হোক আর অসচেতনভাবে হোক জাসদ প্রতিক্রিয়াশীলদের মাঠে নামতে সহায়তা করেছেন। মেজর ডালিমের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা এবং আওয়ামীলীগ নেতাদের নির্যাতন করা এসময় কুমিল্লার রাজনীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
৭৪ এ জরুরি অবস্থা জারির পরে সারাদেশে সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। কুমিল্লায় দুই দফায় অভিযান চালানো হয়। প্রথম দফায় নিয়মতান্ত্রিক অভিযান পরিচালিত হলেও ২য় দফায় কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতাদের উপর নেমে আসে এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। সাবেক এনএসএফ কর্মী মেজর ডালিম তার উর্দ্বতন কর্মকর্তা কর্ণেল আনোয়ার আনসারীকে ডিঙ্গিয়ে একক সিদ্ধান্তে অভিযান চালান। এ সময় আজিজ খান, আফজল খান, আব্দুর রউফ, রুস্তম আলীসহ কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করার দায়ে ডালিমকে সেনাবাহিনী থেকে সাসপেন্ড করা হয়। সারা দেশের মত কুমিল্লাতেও রক্ষীবাহিনী সক্রিয় ছিল। তারা কুমিল্লা টাউন হলে ক্যাম্প স্থাপন করে। এজন্য দীর্ঘসময় পর্যন্ত টাউন হল বন্ধ রাখা হয়। তবে কুমিল্লাতে রক্ষীবাহিনীর বাড়াবাড়ি করার কোন ঘটনা জানা যায়নি। পাশাপাশি জাসদের গণবাহিনীও কুমিল্লাতে বড় ধরনের কোন কার্যকলাপ করেনি। বলা চলে সারাদেশের তুলনায় কুমিল্লা যথেষ্ট শান্ত ছিল। এরই মাঝে বাঙ্গালী জাতির জীবনের সবচেয়ে দুর্যোগময় ঘটনা ঘটে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক চক্রান্তে এবং স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের মদদে, সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী অফিসারের হাতে নিহত হন।
নবগঠিত বাকশালের পদ পদবী লাভের তদবিরের জন্য কুমিল্লার অধিকাংশ নেতা কর্মী তখন ঢাকায় ছিলেন। বিয়োগান্তক ঘটনার পর নেতাদের অনেকে কুমিল্লায় ফিরে আসলেও হতবিহব্বল কর্মীদের তারা কোন দিক নির্দেশনা দিতে পারেননি। কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবদুল্লা হারুন পাশা এবং পুলিশ সুপার ইসমাইল হোসেন মোশতাক সরকারের নির্দেশেই পরিচালিত হন। তবে এসময় কয়েকজন অসীম সাহসী তরুণ নিজস্ব উদ্যোগে টাউন হল মাঠে বঙ্গবন্ধু স্মরণে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করেন। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা দিপক রায় বলেন, “আনুমানিক ১৬ অথবা ১৭ আগষ্ট বাদ আসর কুমিল্লা টাউন হল মাঠে আমরা গায়েবানা জানাযার আয়োজন করি এতে আমি, মুজিবুল হক, হাবিবুস সালেকীন রুমি, মজিবুর রহমান শহীদ, রুস্তম আলী, জহিরুল ইসলাম সেলিম, আবুল কাশেম শোভাসহ শতাধিক নেতাকর্মী অংশ গ্রহণ করি। এ জানাজার আয়োজনে কান্দিরপাড় মসজিদের ঈমাম মাওলানা ইসহাক সাহেবের অবদান অপরিসীম। তিনি সাহস করে এ জানাজা না পড়ালে আমাদের পক্ষে কাজটি কঠিন হত’। যদিও রুস্তম আলী জানাজার সময়টি বাদ জোহর বলে উল্লেখ করেন। জহিরুল ইসলাম সেলিম বলেন - ‘এ জানাজা শেষে আমরা শোভাযাত্রাসহ ভিক্টোরিয়া কলেজ শহীদ মিনারে যাই এবং সেখানে আমি বক্তব্য রাখি’। সে দিনের প্রেক্ষাপটে এটি অবশ্যই একটি সাহসী উদ্যোগ।
’৭৩ এ দেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে কুমিল্লার সবকটি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে। চান্দিনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলী আশরাফ জয়লাভ করেন। কিš' দুটি আসনে আওয়ামী লীগের বিজয় প্রশ্নবিদ্ধ। প্রথমটি হচ্ছে দাউদকান্দিতে জাসদ প্রার্থী রশীদ ইঞ্জিনিয়ারের বিরুদ্ধে খন্দকার মোশতাক, দ্বিতীয়টি দেবীদ্বারে ন্যাপের অধ্যাপক মোজফফর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর বিজয়। প্রশ্নবিদ্ধ এ বিজয় আওয়ামী লীগকে গৌরবান্বিত করেনি বরং কলংকিত করেছিল। এ সময়ে রাজনৈতিক অ¯ি'রতার মাঝেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের পালাবদল ঘটেছে নিয়মিত ভাবে। ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দলের সভাপতি ছিলেন খন্দকার মোশতাক, সাধারণ সম্পাদক আবদুল আউয়াল (কচুয়া)। ৭৩ এ নেতৃত্বের পালাবদলে সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক খোরশেদ আলম, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবদুর রউফ। পরবর্তীতে ৭৫ এ আবার অধ্যাপক খোরশেদ আলম সভাপতি আবদুল আউয়াল (লাকসাম) সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাকশাল প্রবর্তিত হলে অধ্যাপক খোরশেদ আলম গভর্নর নিযুক্ত হন, মফিজুর রহমান বাবলু জানান, নবগঠিত বাকশালের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন জহিরুল কাইয়ূম। এ সময় স্বাধীনতাত্তোর কুমিল্লা পৌরসভার প্রথম নির্বাচনে আবদুল আউয়াল চেয়ারম্যান এবং আফজল খান ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর একদিকে আওয়ামী লীগের কিংকর্তব্যবিমুঢ় অব¯'া অপরদিকে সংগঠিত কোন রাজনৈতিক দলের অনুপ¯ি'তিতে কুমিল্লা তথা দেশে এক ধরনের নৈরাজ্যকর পরি¯ি'তি বিরাজ করছিল।আওয়ামী লীগের মাঠের কর্মীরা যখন প্রতিরোধের ডাকের অপেক্ষায়, মূল নেতৃত্ব তখন উদভ্রান্ত দিকভ্রান্ত। এ প্রসঙ্গে এডভোকেট রুস্তম আলী বলেন ‘আমরা আমাদের অস্ত্রশস্ত্রসহ যুদ্ধের প্র¯'তি নিয়ে বসে ছিলাম ১৫ দিন। কিš' কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে প্রতিরোধের কোন ডাক আসেনি। পরে পুলিশের হয়রানির মুখে কুমিল্লা ছাড়তে বাধ্য হই’। এমনি ভাবে রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা নেমে আসে। ঢাকায় তখন ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হচ্ছিল। আবার খন্দকার মোশতাকের প্রভাব কুমিল্লার অনেক আওয়ামীলীগ নেতার উপর ছিল। জহিরুল হক দুলাল বলেন ‘১৫ আগষ্টের পরে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাই খন্দকার মোশতাকের সাথে সম্পর্ক রেখে চলতেন। কুমিল্লার দুইজন আওয়ামী লীগ নেতা তখন খন্দকার মোশতাকের সাথে লাল টেলিফোনে কথা বলতে পারতেন।’ প্রভাবশালী মুসলিমলীগাররা যারা এতদিন কোনঠাসা অব¯'ায় ছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্র যারা আত্মগোপনে ছিলেন তারা বেরিয়ে আসলেন সদর্পে। দৃশ্যপটে আসলেন জিয়াউর রহমান। আওয়ামীলীগ ভীত সন্ত্রস্ত, অসংগঠিত এবং কোনঠাসা অব¯'ায় থাকলেও তাদের সামনে দাঁড়ানোর মত কোন রাজনৈতিক দল ছিলনা। কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জাসদ তার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলে। তাছাড়া কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসি প্রদানের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান জাসদের প্রতিও স্টীমরোলার চালান তাই আওয়ামীলীগকে মোকাবেলা করার জন্য একটি রাজনৈতিক শক্তি জিয়াউর রহমানের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তারই প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে জিয়াউর রহমান প্রথমে গঠন করলেন জাগদল।
স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী, পিকিং পš'ী গ্রুপ, বিচ্যুত বাম এবং সুবিধাবাদী আওয়ামীলীগাররা এসে ভিড় করলেন এই জাগদলে। এদের বাইরে কিছু অরাজনৈতিক ইমেজ সম্পন্ন ব্যক্তিকেও জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে টেনে আনেন। কুমিল্লাও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৯৭৮ সালে দাউদকান্দির ড. এম.আর খান এবং দেবিদ্বারের ক্যাপ্টেন সুজাত আলীকে যুগ্ম আহবায়ক এবং সদরের আবদুল আউয়ালকে সদস্য সচিব করে জাগদলের কমিটি গঠন করা হয়। ৭৩ এ যে সুজাত আলীর জোর পূর্বক বিজয়ের জন্য আওয়ামীলীগ কলংকিত হল সেই সুজাত আলীই এগিয়ে আসলেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
এসময় জেলা উন্নয়ন সমন্বয়কারী নামে একটি পদ সৃষ্টি করে জাহিদ হোসেনকে এ পদে বসানো হয়। অনেকটা বাকশালের গভর্নরের আদলে। জাহিদ হোসেন জেলার উন্নয়ন তদারকি চাইতে সরকারী ক্ষমতা ব্যবহার করে জাগদলের কর্মকা- তদারকীতে ব্যস্ত ছিলেন বেশি। সাজেদুল হক, ওয়াদুদ মিয়ার মত লোকেরাও শক্তি জুগিয়েছেন জিয়াউর রহমানের দলের ভীত রচনায়। জনমনের হতাশা এবং ব্যক্তি জীবনে জিয়াউর রহমানের এক ধরনের সৎ ইমেজও এই দলের প্রতিষ্ঠায় কিছুটা ভূমিকা রাখে। যদিও রাজনীতিতে অর্থের অনুপ্রবেশ, দুর্নীতিবাজদের রাজনীতিতে অবাধ সুযোগ দেয়া, মাসলম্যানদের দৌরাত্ম্য, সরকারি গোয়েন্দা সং¯'া সমূহকে রাজনৈতিক দলে ভাঙ্গন ও নেতা সংগ্রহে ব্যবহার এগুলি জিয়াউর রহমানের আমলেই শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে এসব বাংলাদেশের রাজনীতিতে ¯'ায়ী রূপ পেয়েছে। সর্বোপরি সেনাবাহিনীতে এত বেশী ক্যু এবং পাল্টা ক্যু হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনটা আর কখনও ঘটেনি। এমনি ধরনের একটি ক্যূ প্রচেষ্টায় খোদ জিয়াউর রহমানও নিহত হন। সদর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দিন বাহারের ভ্রাতা মুক্তিযোদ্ধা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা মাইনউদ্দিনকেও এসময় হত্যা করা হয়। এ সমস্ত ঘটনায় সেনাবাহিনীর বহু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা আিফসার নিহত হন। অপর দিকে সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান প্রত্যাগতদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সমস্ত প্রক্রিয়ায় তিনি হয়তো তার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করলেন কিš' রাজনৈতিক ব্যব¯'াটি ধ্বংস হয়ে গেল। এই জাগদলটিই পরবর্তীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিতে রূপান্তরিত হয়। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে রাজনৈতিক দল না বলে রাজনৈতিক কাব বলাই যুক্তিসঙ্গত। কারণ আওয়ামীলীগ বিরোধীতা, ভারত বিরোধীতা এবং ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ, এটিই ছিল এ দলের মূল ভিত্তি। জিয়াউর রহমান এ সময় হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমে তার ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে জনগণের ম্যান্ডেট নেন।
বলাবাহুল্য সারাদেশের মত কুমিল্লাতেও হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছিল। অবশ্য না জয়যুক্ত হবার কথা কেউ কল্পনা করারও সাহস করেনি। ১৯৭৯ সালে কুমিল্লায় জাগদল বিলুপ্ত করে জাতীয়তাবাদী দলের কমিটি গঠন করা হয়। জেলা বিএনপির প্রথম আহবায়ক মুসলিমলীগের সাবেক এমপি আব্দুল ওয়াদুদ, যুগ্ম আহবায়ক আব্দুল আউয়াল ও দুলা মিয়া। প্রথম পূর্ণাঙ্গ কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন আলী হোসেন, সাধারন সম্পাদক আবদুল আউয়াল শহর বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন আব্দুল জলিল সাধারণ সম্পাদক হন জাহাঙ্গীর আহমেদ। এই কমিটি খুব দ্রুত অঙ্গসংগঠন সমূহের কমিটি নির্বাচন করেন। যেমন সফিকুর রহমান, আবদুর রউফ চৌধুরী ফারুক ও আলাউদ্দিন আহমেদকে যথাক্রমে সভাপতি সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠন করা হয়। ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি শাহ আলমকে সভাপতি এবং মোশতাক আহাম্মেদকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কমিটি গঠন করা হয়। শ্রমিক দলের সম্পাদক নির্বাচিত হন কামালউদ্দিন কালু সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার। খায়রুন নাহার ইসলামকে আহবায়ক করে গঠন করা হয় মহিলা দলের কমিটি। কুমিল্লার আবুল কাশেম (সাবেক যুব মন্ত্রী) জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রবীণরা নীতি নির্ধারণী বিষয়ে থাকলেও মূলত তরুণরাই এসময় কুমিল্লাতে বিএনপিকে সংগঠিত করতে ভূমিকা রাখেন। এ প্রসঙ্গে আবদুর রউফ চৌধুরী ফারুক বলেন, ‘শাহ মো. সেলিম, আলাউদ্দিন আহমেদ, মনিরুল হক সাক্কু এবং আমি রাজপথে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে তিল তিল করে সংগঠনকে গড়ে তুলি। বিশেষ করে দলের কোন পদে না থাকলেও মনিরুল হক সাক্কু আওয়ামী লীগের ভায়োলেন্স মোকাবেলায় রাজপথে তার কর্মী বাহিনী নিয়ে সদা প্র¯'ত ছিলেন। যা বিএনপিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অনেক দূর। আমি শহীদ জিয়ার উপ¯ি'তিতে চট্টগ্রামের আলমাস হলে ছাত্রদলের প্রতিনিধি সম্মেলনে বক্তব্য রাখি। এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন’। এরই মাঝে ১৯৭৯ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জেলার অধিকাংশ আসনে বিএনপি জয়লাভ করে। সদর আসনের সংসদ সদস্য হন লে. কর্নেল আকবর হোসেন।
আওয়ামী লীগ দুটি আসনে জয়লাভ করে কর্ণেল (অব.) আনোয়ার উল্যাহ এবং জয়নাল আবেদীন। সারাদেশে আওয়ামী লীগ যদিও মাত্র ৩৯টি আসনে জয়লাভ করে তথাপিও এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই আওয়ামীলীগের সংগঠিত হবার সুযোগ আসে। সে অর্থে নির্বাচনে পরাজিত হলেও আওয়ামী লীগের এটি রাজনৈতিক বিজয়। পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী আবদুল জলিল আফজল খানকে ৬২ ভোটে হারিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ বিজয় অর্জন করেন। ‘৭৯ এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ আবারো সুসংগঠিত হতে থাকে। অবশ্য এ সময় নেতৃত্বের প্রশ্নে মিজানুর রহমান চৌধুরী পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠন করলে এডভোকেট আহমেদ আলী, এডভোকেট আমীর হোসেন, আব্দুল মালেক, মাইনুল হুদাসহ কুমিল্লার অনেক নেতাই তার সাথে যোগদেন। জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আবদুল আজিজ খান সভাপতি এবং অধ্যক্ষ আবদুল কালাম মজুমদার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অপরদিকে শহর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আফজল খান সভাপতি এবং আকম বাহাউদ্দিন বাহার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। অপরদিকে ছাত্রলীগের একপক্ষে কাজী আবুল বশির ও আনিসুল ইসলাম বাবুল অপরপক্ষে রেজাউল করিম শামীম ও সফিকুল ইসলাম শিকদার। জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগে সারাদেশের মত কুমিল্লাতেও ১৯৭৭ সনে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্র শিবির রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। ইসলামী ছাত্র শিবির প্রম থেকেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজকে তাদের লক্ষ্যব¯'তে পরিণত করে। এসময়ে তাদের নির্মম হামলার শিকার হন ছাত্রনেতা আরফানুল হক রিফাত। শিবিরের কুমিল্লা জেলা শাখার প্রথম সভাপতি জসিম উদ্দিন সরকার। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে জামায়াতের নেতৃত্বে কারা ছিলেন তা জানা যায়নি। খন্দকার মোশতাকের জনসভা পন্ড হয়ে যাওয়া এসময়ে রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর খন্দকার মোশতাক ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) এর ব্যানারে কুমিল্লা টাউন হলে জনসভা করতে আসলে ছাত্রলীগের কর্মীরা তীব্র ঘৃণা সহকারে সেই জনসভা ভেঙ্গে দেয়। ‘৮১ সনে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের সাথে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাত্রলীগের শফিক-জাহাঙ্গীর পরিষদ জয়লাভ করে। নির্বাচনে ছাত্রদলের ভরাডুবি ঘটে। শফিক-জাহাঙ্গীর পরিষদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে আকম বাহাউদ্দিন বাহারের উত্থান ঘটে। প্রবীর হত্যাকা- এ সময়ের আলোচিত হত্যাকা-। ১৯৮১ এর ১৭মে এক বৃষ্টি¯œাত দিনে লাখো জনতার শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরে আসলেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা। মুজিব দুহিতার আগমনে সারা দেশের মত কুমিল্লাতেও আওয়ামী লীগ কর্মীদের মাঝে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।  ১৯৮১ সনের ৩০ মে এক বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান নিহত হলেও রাষ্ট্রক্ষমতা বিএনপির নিকটই ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী ড. কামাল হোসেনকে হারিয়ে বিএনপি প্রার্থী বিচারপতি আবদুল সাত্তার জয়লাভ করেন। ১৯৮২ সনের ২৪ মার্চ এক রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনা প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন। রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। দেশে মার্শল ল জারী করা হল। দেশের বিভিন্ন জেলায় আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসকের কার্যালয় ¯'াপনের মাধ্যমে সামরিক সরকার তার তৎপরতা চালায়।
কুমিল্লা অঞ্চলের আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন মেজর জেনারেল আমসা আমীন। পাশাপাশি চলতে থাকে রাজনৈতিক দল গঠনের তৎপরতা। প্রমে ১৮ দফা বাস্তবায়ন পরিষদ দিয়ে শুরু। এডভোকেট গোলাম মোস্তফা চৌধুরীকে আহবায়ক করে ১৮ দফা বাস্তবায়ন পরিষদ তাদের কমিটি গঠন করে। এই কমিটি এরশাদের পক্ষে জনমত সংগ্রহের চেষ্টা করে খুব একটা সাফল্য লাভ করতে পারেনি। এর পরই দৃশ্যপটে আসলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। আনসার আহমেদকে আহবায়ক আবদুল আউয়াল এবং আনোয়ারুল কাদের বাকীকে যুগ্ম আহবায়ক করে কুমিল্লা জেলা জাতীয় পার্টির প্রথম কমিটি গঠিত হয়।
কিছুদিন পর ঘরোয়া রাজ





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};