ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
127
আমার ঈদের সেকাল-একাল
Published : Tuesday, 4 June, 2019 at 12:00 AM
আমার ঈদের সেকাল-একালআবুল হাসানাত বাবুল ||
পবিত্র ঈদুল ফিতরের একাল-সেকাল নিয়ে একাধিকবার লিখেছি। নতুন করে লিখলে একই কথা বারবার ওঠে আসবে। আর তথ্যগতভাবে একাল বললে বর্তমান প্রজন্মই আসবে। সেকাল যার যার বয়স অনুযায়ী হবে। যার বয়স কমপক্ষে ষাটের উর্ধে হতে পারে। সত্তর কিংবা আশি তার স্মৃতিচারণ সেকাল হতে পারে কিন্তু সেকাল কেবল সত্তর কিংবা আশি বছর পূর্বের কথাই একমাত্র কথা নয়। আরো আগের কথা হতে পারে। শত বছর আগের কথা কিংবা শত শত বছর আগের কথা। আমাদের দেশে শাসনামল বলতে মোগল, সুলতান, নওয়াব-জমিদারকাল বিশেষভাবে বোঝায়। নওয়াব-জমিদার কাল বলতে সাধারণত বৃটিশ শাসনকালকেই বুঝে থাকি। নওয়াব-সুলতানদের জাগরণ ঘটে। যেমন টিপুসুলতান, নওয়াব সিরাজউদৌলা। তবে তারা স্বাধীন ছিলেন। তেমনিভাবে দেশীয় রাজা মহারাজাদেরও অবস্থান ছিল। ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ভারত দখল করে বৃটিশ কলোনী বানাবার সময়ও দেশী নওয়াব-রাজা-মাহারাজ ছিল। তারা স্বাধীনভাবেই তাদের রাজ্য শাসন করেছে। যেমন ত্রিপুরা রাজ্য। তবে রাজমালায় আছে ত্রিপুরার রাজা মহারাজারা স্বাধীন থাকলেও বৃটিশদের প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল। প্রতি বছর প্রচুর উপঢৌকন দিয়ে দিল্লীর গভর্ণর জেনারেলকে সন্তুষ্ট করাতেন। যাক আমাদের বিষয় ঈদের একাল-সেকাল। প্রসঙ্গক্রমে ঈদের সেকালের বর্ণনা করতে গেলে শত বছর আগের কথা যেমন আসবে তেমনি ভাবে আরো আগের প্রসঙ্গও আসবে। আমাদের কাছে সহজ করে বললে তিনটি কালই প্রাধান্য পাবে। যেমন বৃটিশকাল, পাকিস্তান শাসনকাল আর বর্তমান বাংলাদেশকাল। দেশের সূচনাকাল ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধে গোটাজাতি জড়িয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা যেমন হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ছিল ঠিক তেমনিভাবে জাতি ছিল মুক্তির স্বাদ কবে পাবে সেই আকাংখায়, তখন দেশ পূর্ব ও পশ্চিমে। পূর্বে পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌমিক বাংলাদেশ করাবার জন্য যেমন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তেমনিভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীন দেখবার লক্ষ্যে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত বাঙ্গালীরা বিনা বিচারে কারাগারে জীবনযাপন করছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়াওলালী কারাগারে বন্দী জীবন যাপন করছিলেন। যারা সেনা-নৌ-বিমান বাহনীতে ছিলেন সেইসব বাঙ্গালীদের ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই কারাগারে নেয়া হয়। কারাগার মানে চার দিকে দেয়ালযুক্ত নয়। চারদিকে তারকাটা বেড়া দিয়ে এককোঠাযুক্ত টিন সেড ঘরে পারিবারগুলো গাদাগাদি করে থাকতো। এমন অবস্থায় আমারও জীবন যাপন করতে হয়েছে। সেই বন্দীজীবন যাপনকালের ঈদে পোলাও-কোরমা খাওয়া দূর থাক দুপুরের ভাত খাওয়ারও নিশ্চয়তা ছিলনা। আমার কলেজ ছাত্রের আইডিকার্ড ছিল। তা দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে বের হয়ে আন্তর্জাতিক রেডক্রস অফিসে গিয়ে অবস্থার বর্ণনা করলে তারা কয়েক বস্তা চাল ও মশুর ডাল দিয়েছিল। রেডক্রস অফিসে দেশী বিদেশী সব অফিসারই ছিল। তারা দ্রুত সেই চাল-ডাল দিয়েছিল। গাড়ী ঠিক করে দ্রুত ক্যাম্পে গিয়ে আমাদের ক্যাম্পের ৫১টি পরিবারের প্রতিটি পরিবারে গড়ে চার কেজি করে চাল দেয়ায় সেবার ৪৫৬ জন দুপুরে খাবার খেয়েছিল। এমন অবস্থা সব ক্যাম্পেরই ছিল। সব ক্যাম্পেই যুবকেরা এই দায়িত্ব পালন করতো। একই রকম তথ্য পেয়েছিলাম আলহাজ্ব ওমর ফারুকের কাছ থেকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তারা আগরতলায় ছিলেন। সে বছরের রোজার ঈদে তারা খিচুরির ব্যবস্থা করে। ক্যাম্পে ষাট-সত্তরজন। খাবার জোগার করতে পারলেও সংকট ছিল পানির। তারা থাকতেন টিলার ওপরে। হৃদের পানির স্তর ছিল নীচে। পঞ্চাশজনকে তিনি ওপর থেকে নীচে দাড় করিয়ে দিলেন। বালতি দিয়ে পানি হাতে হাতে ওপরে উঠিয়ে এনে রান্নার ও পানীয় পানির ব্যবস্থা করলেন। সেই রোজার ঈদে তারা খিচুরি খেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের রোজার ঈদ পালন করেছেন এমন কেউ যদি বেঁচে থাকেন তাদের সবার স্মৃতিচারণায় এমন বেদনার কথাই ওঠে আসবে। লেখক আবদুল আওয়াল হেনা এক স্মৃতিচারণে ১৯৭১ সালের ঈদের প্রসঙ্গ এনেছেন। কুমিল্লায় ঈদের প্রধান জামাত হয় কেন্দ্রীয় ঈদগাহে। সে বছর সেনা কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জানিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতে ভারত সীমান্ত থেকে বোমা সেলিং হতে পারে। সেজন্য ঈদগাহে নামাজ আদায় করা যাবেনা। তখন কুমিল্লার বিশিষ্ট নাগরিক সুলতান মাহমুদ মজুমদার উদ্যোগ নিলেন ঈদের নামাজের। তিনি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ও ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। পরে সাব্যস্থ হলো ভিক্টোরিয়া কলেজের টেনিস গ্রাউন্ডে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের নামাজ সে বছর এক ভয়ের মধ্যে ভিক্টোরিয়া কলেজের টেনিস গ্রাউন্ডে হয়েছিল। সেজন্য বলছিলাম সেকাল বলতে কোন কালকে আনবো। আমোদ সম্পাদক মো. ফজলে রাব্বী থেকে শুনেছিলাম বৃটিশ আমলের শেষের দিকে ঈদের চাঁদ দেখা গেলে কুমিল্লা রেল স্টেশন থেকে ট্রেনের হর্ণ আনন্দে বাজানো হতো। তখন সবাই বুঝতো ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। ১৯৪৭ সালের পর সাইরেন বাজানোর সূচনা হয়। সিভিল ডিফেন্স তখন খুব সক্রিয়। বর্তমান ছোটরা কলোনীতে সিভিল ডিফেন্স সদস্যরা সাইরেন বাজিয়ে ইফতারের সময়সূচী, চাঁদ দেখার বিষয় জানিয়ে দিত। পরে রাণীর বাজার নোনাবাদে সাইরেন বাজানোর বিষয়টা স্থায়ী হয়। দেশ স্বাধীন হবার পর এই দায়িত্ব পালন করে আসছে ফায়ার সার্ভিস। আমার স্মৃতিতে আছে শাহ সুজা মসজিদের আজানের ধ্বনি। বর্তমান পুরনো গোমতী তখন প্রবাহিত গোমতী। তার উত্তর পাড় চান্দপুর গ্রাম আমাদের নিবাস। সম্ভবত তখন ১৯৫৭-৫৮ সাল। ইফতার করার ইঙ্গিত একমাত্র আজান। নদীর আইলে অপেক্ষা করতাম কখন আজান দিবে। অপর পাড়ে শাহসুজা মসজিদ। সবদিক উন্মুক্ত খোলা। নামে মাত্র কিছু বাড়ী। মধুর আজানের ধ্বনি যখন শাহসুজা মসজিদ থেকে ভেসে আসতো দিতাম ভোদৌড়। চিৎকার করে বলতাম আজান পড়ে গেছে। বাড়ীর মহিলাদের কাছে আমি তখন শিশুনা। বড় কেউ বার্তা বাহক। তারা ইফতার করতেন। তখন এত রকমারী ইফতার ছিলনা। নামে মাত্র ছোলা ভাজা। অনেকে পানি মুখে দিয়ে ভাত খেয়ে ফেলতো। আজকাল পসরা সাজিয়ে যেভাবে ইফতারীর পণ্য বিক্রি করা হয় তখন এ ধরনের দোকান কল্পনাও করা যেতো না। এছাড়া অর্থনৈতিক অবস্থাও তখন খুব ভালো ছিল না। তবে বাড়ীর আশে পাশে শাক-সবজি-মাছ ইত্যাদি খুব সহজেই সংগ্রহ করা যেতো। বাড়ীতে ছিল প্রচুর কলাগাছ। কলার থোর। কলার গাছ কেটে ভিতরে যে কানজল পাওয়া যেতো তরকারি হিসেবে তা ছিল খুবই উত্তম। বাড়ীতে সবাই হাঁস-মুরগী পালন করতো। অনেকে গাভী পালন করতো। এদিক থেকে অনেক পরিবারই স্বচ্ছল ছিল। পরে ইফতারীর সময় জানবার জন্য লালবাতির অপেক্ষা করি। রাজগঞ্জ ট্রাফিক আয়ল্যান্ডের কাছে রাজগঞ্জ বাজারের একতলা দালানের ছাদে লম্বা বাঁশ দিয়ে লালবাতি জালানো হতো। শুনেছি মাওলা বক্স নামের একজন ধার্মিক ব্যক্তি লালবাতি জালাবার ব্যবস্থা করতেন।
সেকালে বাড়ীতে দেখতাম সব মহিলারা নিজের হাতে সেমাই বানাতেন। ঘরের সেমাই দিয়ে ঈদের মিস্টান্ন তৈরী হতো। বাড়ীর পাশের কাটা মেহেদী গাছ কেটে শুকিয়ে নেয়া হতো। ছয় আনা সের ময়দা এনে তা গুলে রোজাদার মহিলারা যোহরের নামাজের আগ পর্যন্ত সেমাই বানাতেন। শাহেদ আলী নামের একজন স্মৃতিতে আছেন শেষরাতে সেহরী খাওয়ার জন্য ডাকতেন বলে। টিনের চোঙ্গা দিয়ে প্রচন্ড শীতের রাতে তিনি ডেকে যেতেন। তিনি পাড়ার দাদা। এভাবেই অনেকে আপন হয়ে যেতেন। আরেক জন আলী আজ্জম দাদা। তিনিও পাড়ার দাদা। এভাবেই অনেকে আপন হয়ে যেতেন। পেশায় দরজি। আমার মেজ ভাই সিলেট থেকে রমজানের প্রথম সপ্তাহে এসে আমাদের কিশোর-তরুণ তিন ভাইয়ের কাপড় কিনে দিয়ে যেতেন আলী আজ্জম দাদার কাছে। তিনি রাজগঞ্জের একটি দোকানে পায়ে চালানো সেলাই মেশিন দিয়ে বানাতেন পাজামা, ফুল হাতা শার্ট, হাফ প্যান্ট, হাফ হাতা শার্ট। তা দিয়ে একবছর চলে যেতো। ঈদের দুদিন আগে এসে বাবার হাতে দিতেন একশত টাকার নোট। জিন্নাহ মার্কা শত টাকার নোট তখন অনেক দাম। পোলাওর চাল, মোরগ, ঘি, যাবতীয় মসলা কেনা হতো। ছোট তিন ভাই তিনব্যাগ পণ্য কাঁধে করে খেয়া পাড়ি দিয়ে কখনো বা খোলা নদীতে হেটে বাড়ী যেতাম মনের আনন্দে। বাড়ীর পাশে দূরের আত্মীয় ফজলু ও হাবিব চাচারা কাগজের টুপি বানাতো। রোজা রেখে কাগজের টুপি বানাতে সাহায্য করতাম। ঈদের আগে চকবাজারে গিয়ে সে টুপি বিক্রি করতো। প্রতিটি টুপি এক আনা করে। আমি একটা টুপি এমনিতেই পেয়ে যেতাম। কাগজের টুপি বানানোতে ছিল শিল্প। কিন্তু তাতে গরীব গরীব ভাব ছিল। মেজ ভাই কেন জানি তা পছন্দ করতেন না। আমাদের সময়ে অর্থাৎ ১৯৬০ সালের গোড়ায় আমাদের আকর্ষণ থাকতো ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমার প্রতি। উত্তম-সূচিত্রা, দিলীপ কুমার- নার্গিস, শামিম আরা- দর্পন, হাবিব- নায়ার সুলতানা, সাবিহা সন্তোষ রহমান- শবনামের ছবির প্রতি সবার আকর্ষণ থাকতো। হিন্দি উর্দু-বাংলা সব ছবিই রূপালী, রূপকথা, লিবার্টি সিনেমা হলে চলতো। সিনেমা হল সেকাল হয়ে গেছে। টেলিভিশনে আজ কাল সিরিয়ালের যুগ। ঘরের মহিলারা দেখেন ভারতীয় সব চ্যানেল গুলো। আমাদের কালেও আমরা বোম্বাই (মোম্বে) কলকাতা, লাহোরের সিমোই বেশি দেখতাম।
০১৭১৪-৯৮৬৭২১





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};