ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
268
ভাষণে বঙ্গবন্ধু- মানস
Published : Tuesday, 11 June, 2019 at 12:00 AM
ভাষণে বঙ্গবন্ধু- মানসশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে যে মুক্তিযুদ্ধ হয় ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে, বঙ্গবন্ধু পরাধীন দেশে শেষ ভাষণ দেন ৭ মার্চ। এই ভাষণের মূল বাণী উচ্চারিত হয়েছিল এই বলে ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
তারপর ২৫ মার্চ ১৯৭১-র মধ্যরাতে ২৬ মার্চ-এর প্রথম প্রহরে স্বাধীনতা ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু।
স্বাধীনতা ঘোষণা
“এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তা দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারীর মোকাবিলা করার জন্যে আমি আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।”
তারপর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সৈন্যদ্বারা গ্রেফতার হন এবং তাঁকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়, কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়, দেশদ্রোহী হিসেবে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিচার কাজ শুরু করা হয়।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ তৎকালীন ভুট্টো সরকার বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্ত মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন ও ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বাধীন বাংলাদেশে পদার্পণ করেন। সমগ্র জাতি তাঁকে প্রাণের সকল আকুতি ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বরণ করে নেয়। ১০ জানুয়ারির সকালটা কেমন ছিল?
‘আজি এ প্রভাতে রবির কর
কেমনে পশিল প্রাণের পর,
কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান।
না জানি কেন রে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উঁথলি উঠেছে বারি,
ওরে, প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।।’
বঙ্গবন্ধু যখন বিমান থেকে অবতরণ করে তৎকালীন রেইসকোর্স ময়দানের দিকে খোলা গাড়িতে করে অকৃত্রিম অনুসারীদের নিয়ে হাত নেড়ে হেসে-কেঁদে অগ্রসর হচ্ছিলেন, স্বাধীন বাঙালি প্রাণ উজাড় করে গেয়ে উঠল-
‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জোতির্ময়
     তোমারি হউক জয়।
তিমির বিদার উদার অভ্যুদয়,
     তোমারি হউক জয়।
হে বিজয়ী বীর, নবজীবনের প্রাতে
নবীন আশাব খড়্গ তোমার হাতে,
জীর্ণ আবেশ কাটো সুকঠোর ঘাতে।
     বন্ধন হোক ক্ষয়,
     তোমারি হউক জয়।।’
সেদিন বঙ্গবন্ধু জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন-
‘নেতা হিসাবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি, আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকরা যদি চাকুরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে- পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তা-ঘাট ভেঙ্গে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে। আপনারা নিজেরাই সেসব রাস্তা মেরামত করতে শুরু করে দিন। যাঁর যা কাজ, ঠিক মত করে যান। কর্মচারীদের বলছি, আপনারা ঘুষ খাবেন না। এই দেশে আর কোন দুর্নীতি চলতে দেয়া হবে না।’
বঙ্গবন্ধু ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৫ জানুয়ারি ১৯৭২ দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন-
‘আমি কখনো প্রধানমন্ত্রী হতে চাইনি। আমি শুধু আমার জনগণের জন্যে স্বাধীনতাই চেয়েছিলাম।....
কর্মী ভাইয়েরা, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে তোমাদের একটি সুখী জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। আমাদের দল একটি গণতান্ত্রিক দল। ......
প্রতিশোধ গ্রহণের পথ তোমাদের ত্যাগ করতে হবে। ......
দালালদের উপযুক্ত শাস্তি সরকার নিশ্চয়ই দেবে।’
একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সময় সুযোগ সন্ধানীরা অনেক অনৈতিক উপায়ে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে তৎপর হয়। সেজন্য ১৬ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি ‘কালোবাজারীদের ক্ষমা করা হবে না’ বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন-
‘মুনাফাখোর আর কালোবাজারীরা যদি পরিস্থিতির সুযোগ নেবার চেষ্টা করে তবে তাদেরকে কঠোর পরিণাম ভোগ করতে হবে।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আপামর জনগণ অংশগ্রহণ করছিলেন। তাতে ৩০ লক্ষ শহীদ হয়েছেন, ৫ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জীবিত যাঁরা তাঁরা গণবাহিনী হিসেবে পরিচিত। বঙ্গবন্ধু ১৭ জানুয়ারি ১৯৭২ ‘গণবাহিনীর দেশ প্রেম অতুলনীয়’ বলে স্বীকৃতি জানিয়ে তাঁদের উদ্দেশে বলেন-
‘বাংলাদেশের জনগণ এবং আমার সরকারের পক্ষ থেকে আমি গণবাহিনী সকল সদস্যের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা এবং আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে গণবাহিনীর সকল সদস্য যে দেশপ্রেম এবং শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়েছেন তা অতুলনীয়। মুক্তিবাহিনীর বীর সদস্যরা দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রক্ত দিয়ে, যে আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন তা কখনো বৃথা যাবে না।’
তখনই বঙ্গবন্ধু দেশের বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে গণবাহিনীর বীর ভাইয়েরা তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে তাঁদের অস্ত্র জমা দিতে আহ্বান জানান। তারপরে যাদের কাছে অস্ত্র থাকবে, তা বেআইনী বলে বিবেচিত হবে ঘোষণা দেন।
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু টাঙ্গাইলের জনসভায় পরিষ্কার জানিয়ে দেন- ‘গরীব হবে রাষ্ট্র ও সম্পদের মালিক’। তিনি বলেন-
‘গরীব হবে এই রাষ্ট্র এবং এই সম্পদের মালিক, শোষকরা হবে না। এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্রের মানুষ হবে বাঙালী। তাদের মূলমন্ত্র- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’
৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ ঢাকা স্টেডিয়ামে মুক্তিবাহিনীর সকল দলের অস্ত্র সমর্পণ উপলক্ষে বলেন ‘ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত থাকুন।’ তিনি বলেন-
১. আমাদের সংগ্রাম কোন দেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়। আমরা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব।
২. চিরদিনের জন্য আমি আপনাদের কাছ থেকে অস্ত্র নিচ্ছিনা। প্রয়োজন হলে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবিলা করার জন্যে আমি আবার আপনাদের অস্ত্র ফেরত দেব।
৩. স্বাধীনতা লাভ করা যেমন কঠিন, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমনি কঠিন। আমাদের অস্ত্রের সংগ্রাম শেষ হয়েছে। এবার স্বাধীনতার সংগ্রামকে দেশ গড়ার সংগ্রামে রূপান্তরিত করতে হবে। মুক্তির সংগ্রামের চেয়েও দেশ গড়ার সংগ্রাম কঠিন।
১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন-
‘এখন থেকে অতীতের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব পরিবর্তন করে নিজেদের জনগণের খাদেম বলে বিবেচনা করতে হবে।’
৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ কলকাতা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরস্থায়ী।’ এবং একথাও বলেন-
‘আমার বাংলা তিতুমীরের বাংলা, আমার বাংলা সূর্য সেনের বাংলা, আমার বাংলা সুভাষ বসুর বাংলা, ফজলুল হকের বাংলা, সোহরাওয়ার্দ্দীর বাংলা। এ বাংলার মাটি পলি দিয়ে গড়া, বড়ো নরম মাটি। বর্ষায় এ মাটি বড়ো নরম হয়ে যায়। কিন্তু চৈত্রের কাঠফাটা রৌদ্রে এই মাটিই এমন কঠিন শিলায় পরিণত হয় যে, তখন তা দিয়ে যে কোন ষড়যন্ত্র আর যে কোন ষড়যন্ত্রকারীর মাথা ভাংগা যায়। আমার দেশের মানুষও ঠিক এই মাটিরই মতো। তারা শান্ত। তারা শান্তি প্রিয়। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে তারাই আবার ইস্পাত দৃঢ় কঠিন।’
ঐ দিন কলকাতা কর্পোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা সভায় বলেন-
‘বাংলাদেশ যে চারটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত তার অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা, আমার সরকার বিভিন্ন মতাবলম্বী লোকের মধ্যে কোন পার্থক্য করবে না।’
প্রেস ক্লাবের সংবর্ধনায় বলেন-
১. শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর।’
২. ‘বাংলাদেশে কেউ না খেয়ে মরবে না, সবাই এদেশে সুখি ও তৃপ্ত জীবনযাপন করবে।’
৮ মে ১৯৭২ সারদা পুলিশ একাডেমিতে পুলিশদের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘পুলিশ জনগণের সেবক।’
‘আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ। রক্ত দিয়ে আপনারা যে গৌরব অর্জন করেছেন, আশা করি ভবিষ্যতে সে গৌরব আপনারা রক্ষা করবেন।’
বলেছেন,
‘আপনাদের মহানুভবতা আছে, ভালবাসা আছে। মানুষের সঙ্গে মিশবার যে কৌশল আপনাদের আছে, তার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। আপনাদের মনে রাখতে হবে যে, আপনারা এদেশেরই সন্তান।’
৯ মে ১৯৭২ রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দানে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন-
১. আপনারা আমাকে ভালোবাসেন- আমি আপনাদের ভালোবাসি। আমি যাবার বেলায় বলেছিলাম, আমি যদি মরে যাই, আমি যে ডাক দিয়ে যাব- আমার বাংলার মানুষ অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করবে। আপনারা তা করেছেন।
২. আমি কি চাই? আমি চাই আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক।
আমি কি চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক।
আমি কি চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণ ভরে হাসুক।
৩. আমার বাংলার মানুষ। যারা আমাকে ভালবাসে তারা অস্ত্র জমা দিয়েছে। এখনও দু’চার জন যারা অনেকে নিজেকে মুক্তিবাহিনী বলেন, অথচ তারা মুক্তিবাহিনীর লোক নন, তারা অস্ত্র জমা দেননি। তারা ১৬ তারিখের পরে আচকানডা বদলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গিয়েছে। রাতে তারা সেই অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করে, মানুষকে খুন করে।
১৬ জুলাই ১৯৭২ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন-
১. বিপ্লবের মাধ্যমে এই স্বাধীনতা এসেছে এবং সে বিপ্লব ছিল রক্তক্ষয়ী। এমন বিপ্লবের পরে কোন দেশ কোন যুগে এতটা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে নাই, যা আমরা করছি। আমরা ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করি।
২. অনেকে ভারতীয় চক্রান্তের কথা বলে থাকেন। যারা আমাদের দুর্দিনে সাহায্য করেছে তারা নাকি আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের পকেটে ফেলে রাখবার চেষ্টা করছে। এ ধরনের কথা বলা কি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা? এর নাম কি গণতন্ত্র?
৩. যার আয়ের কোনো প্রকাশ্য উৎস নাই, সেও দৈনিক কাগজ বের করছে। .. পয়সা দেয় কে? ... আমি যদি খবর পাই যে, বিদেশীরা তাদের সাহায্য করছে এবং যদি আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করি তা হলেও কি আপনারা বলবেন, সংবাদপত্রের ও সাংবাদিকদের উপর অন্যায় হামলা করা হয়েছে?
৪. আপনারা শিক্ষিত, আপনারা লেখক, আপনারা ভালো মানুষ। আপনারাই বলুন, কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ। আমরা নিশ্চয়ই আপনাদের সাথে সহযোগিতা করবো।
৮ অক্টোবর ১৯৭২ ডাক্তারদের উদ্দেশ্যে বলেন- ‘দুঃস্থ মানবতার সেবা করুন।’ বঙ্গবন্ধু পি,জি, হাসপাতালের রক্ত সংরক্ষণাগার এবং নতুন মহিলা ওয়ার্ডের উদ্বোধন উপলক্ষে বলেন-
১. আপনারা শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, আপনারা দেশের মানুষ, আপনারা জানেন দেশের অবস্থা কি?
২. পয়সা দিয়ে যে সব কিছু হয় না সেটা আপনারা বুঝেন; পয়সার সাথে সাথে আরেকটা জিনিসের দরকার, সেটা হলো মানবতাবোধ। আমার মনে হচ্ছে...... আমরা যেন মানবতাবোধ হারিয়ে ফেলেছি।
৩. আমি কুমিল্লার সভায় বলেছিলাম যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে বেটে খাওয়া যাবে, বাংলাদেশ সোনার বাংলা করতে পারবেন না যদি সোনার মানুষ গড়তে না পারেন। আপনাদের কাছে বলতে গেলে বলতে হয় আমি যেন আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছি। আমি যেদিকে চাই সেদিকে ‘মানুষ’ খুব কম দেখি। মানুষ এত নীচ হয় কি করে? মানুষ মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে পয়সা নেয় কি করে? মানুষ গরীব-দুঃখীর কাছ থেকে কি করে লুট করে, আমি বুঝতে পারি না।
৪. আমাদের এই দেশে আমরা যারা আছি তারা যদি চরিত্রের পরিবর্তন না করি, তাহলে এমন দিন আসবে, এমন ঝড় আসবে, যে ঝড়ে আপনারা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবেন।
বঙ্গবন্ধু অনুরোধ জানিয়ে ডাক্তারদেরকে বলেন-
৫. আবেদন করছি যে, আপনারা মেহেরবাণী করে আপনাদের মতের এবং কথার একটু পরিবর্তন করুন এবং সেবার মনোভাব নিয়ে মানুষকে সেবা করুন।
তারপর ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের অগাস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল নীতি নির্ধারণী এবং একদলীয় শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ- ভাষণ।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলো যখন দেয়া হয়েছিল, তখনকার প্রেক্ষাপট আর এখনকার প্রেক্ষাপট এক নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে বিনির্মাণ করার জন্য যে সব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাঁর সহযোগীরা এমনভাবে এগিয়ে আসেননি বা কোনো ভূমিকাও রাখেননি। হতে পারে বিশাল ব্যক্তিত্বধারী পর্বতপ্রমাণ মহানায়কের কোনো সিদ্ধান্ত বা মতামতের উপর বক্তব্য দেয়া সাহস কারো ছিল না। বঙ্গবন্ধু কিন্তু স্বাধীনভাবে কেউ মত প্রকাশ করুক, তা চাইতেন, তার প্রমাণ যথেষ্ট আছে। এমন কি কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপও করতে চাননি। যদি চাইতেন তবে তখন জাসদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতো না, প্রতিপক্ষের ভূমিকা নিতে পারতোনা। বিপ্লবী সরকার মূল লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত উদারনীতি গ্রহণ করে না। কারণ, তখন শত্রুরা চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র থেকে বিচ্যুত হয় না। এক্ষেত্রে অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশ যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তখন বঙ্গবন্ধু শরীরীভাবে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে স্বদেশের মাটিতে এসে জাতির পিতার আসনে একটা সময় কাটিয়ে বিপ্লবী সরকারকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দিতে পারতেন। এখানে এই বিষয়টি একটু তাড়াহুড়ো হয়ে গেছে। ফলে ভিতর ও বাইরের প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের যাপিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সুযোগ পেয়ে যায় এবং বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি চলে আসে। মোশতাকচক্র সরব হয়ে উঠে, তাজউদ্দীন আহমদকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান গং- এঁরাও তৎপর ছিলেন না। তাঁরা নেতার অন্ধবাধ্যগতই থেকে গেছেন, নিজেদের সামান্যটুকু অস্তিত্বের সাড়া দেননি। ইতিহাস ব্যাখ্যায় নানাভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২০১৯-এ যা উপলব্ধি করা সহজ ১৯৭৫ সালের পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে তা চিন্তা করাও যায়নি।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলোর মধ্যে যে দিক নির্দেশনা, তাঁর প্রজ্ঞা এবং যাপিত অভিজ্ঞতার আলোকে পরিকল্পনা যা বাস্তবায়নের সূচনায় শুভ যাত্রা শুরু করেছিলেন, তার ধারাবাহিকতা যদি থাকত, তবে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের একনম্বর উন্নত বা সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করত। সেই ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে মূলত ২০০৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। অনেকটা একক প্রচেষ্টায় তিনি এগিয়ে চলছেন বঙ্গবন্ধুর খেরো খাতার সূত্রানুযায়ী। আজ বাংলাদেশের উন্নয়ন পদ্মাসেতুর মতো দৃশ্যমান। এখানেই আমাদের স্বস্তি এবং আমরা নির্ভয় জাগ্রত নাগরিক। আমাদের কণ্ঠে এখন বাধাহীন আঁশমুক্ত ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’
বঙ্গবন্ধুর ভাষণগুলোর মধ্যেই তাঁর সামগ্রিক মনোজগতের আকাক্সক্ষাগুলো প্রতিধ্বনিত। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, সমগ্র জীবন মননে যাপন করেছেন, যা তাঁর মানস-চৈতন্যে লালিত ছিল- তা অকপটে প্রকাশ করেছেন। ভাষণগুলোতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে পূর্ণভাবে স্পর্শ করতে পারি, ইতিহাসের নিরিখে আবিষ্কার করতে পারি।
তিনি একজনই বাঙালি, একজনই বঙ্গবন্ধু, একজনই জাতির পিতা।

তথ্যসূত্র: ভাষণের উদ্ধৃতিগুলো ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষণ’ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।










সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};