ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
87
মুজিববাদ : একটি আধুনিক মতাদর্শ
Published : Tuesday, 9 July, 2019 at 12:00 AM
মুজিববাদ : একটি আধুনিক মতাদর্শশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ।  । 
‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ
ধন্য হল; ধন্য হল মানবজীবন।।’
মানবজীবন দুর্লভ। এ জীবন জীবকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সকল ধর্মসম্প্রদায় নিজ নিজ অভিব্যক্তিতে মানুষের জয়গান করেছে। কেউ বলছে ‘মানুষ অমৃতের পুত্র’, কেউ বলছে-‘সৃষ্টির সেরা জীব’, কেউ বলছে ‘মানুষ ঈশ্বরের সন্তান’ ইত্যাদি। আবার কেউ বলছেন- প্রথমে জীবের মতো জন্ম, আকৃতি বিশেষে মানুষ, আচরণে মহামানব। উত্তরণের ফলে মানব জীবন সার্থক, পূর্ণতা লাভ করে মানুষ হয় অমর; দৈহিক নয়, ইহজাগতিক থেকে চিরকালীন স্বীকৃতি-মানসে। সেজন্য কবিগুরু বলেছেন- ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ;’ আমার অর্থাৎ মানুষের। তাই তো ধন্য হলো মানবজীবন। গানে আছে-
সবারে বাসরে ভালো,
নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে।
আছে তোর যাহা ভালো
ফুলের মত দে সবারে।
এই ‘সবারে’ বলতে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে? মা-বাবা, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজন, পাড়াপড়শি, না যাপিত ধর্মবিশ্বাসী স্বগোষ্ঠি, বিত্তবান, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, সমাজপতি, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, গরিব-দুঃখী, কৃষক-শ্রমিক অর্থাৎ শ্রমজীবী মানুষ- এই সবায় কারা? কবি কিন্তু নির্ধারিত করে কাউকে উদ্দেশ্য করে বলেননি। কাজেই সহজেই বুঝতে হবে এই সবায় হলো মানুষ, একমাত্র মানুষ। তার কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই। সুতরাং মনের কালো ঘুচানোর  জন্য সকলকে ভালবাসতে হবে। এতে কোনো দ্বিধা নেই, দ্বন্দ্ব নেই, নেই কোনো সংকোচ। এটাকে সার্বজনীন ভালবাসা বলা যেতে পারে।
মানুষের মধ্যে ভাল-মন্দ উভয়ই রয়েছে। কিন্তু ভালোটা যদি বিলিয়ে দেয়া যায়- তবেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়। এসব কথা বলা যত সহজ, যাপন করা কি এতই সোজা? এখানেই রহস্য।
যদি কোনো মানুষ তা যাপন করেন, আমরা তাঁকে ক্ষণজন্মা পুরুষ বা মানুষ বলি। তাঁদের জন্ম বিরল। তাঁদেরকে অনেক সময় জীবতাবস্থায় চিনতে পারা যায় না, তাঁরাও নিজেদেরকে তেমনভাবে বিকশিত করতে চান না, প্রকাশ করতে চান না। সাধারণের মধ্যে কখন যে অসাধারণ হয়ে উঠেন, তাও বুঝা যায় না। সে ধরনের ক্ষণজন্মা পুরুষের মৃত্যুর পঞ্চাশ বছর পর আস্তে আস্তে বিকশিত হতে থাকেন। ব্যক্তি নন, সেই ব্যক্তি জীবিতাবস্থায় যে কর্মকান্ড রেখে গেছেন, তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সেই ব্যক্তির জীবনদর্শন স্থায়ীরূপ পেতে আরম্ভ করে। ইতিহাসে চিহ্নিত হন ঐতিহাসিক ব্যক্তি হিসেবে, মতবাদের আলোকে বিবেচিত হন দার্শনিক হিসেবে, সমাজ পরিমন্ডলে পরিণত হন সমাজপতি রূপে, রাজনীতির ক্ষেত্রে স্থান লাভ করেন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, ধর্মচর্চার ক্ষেত্রে হয়ে যান যুগপুরুষ বা ধার্মিক এবং সামগ্রিক শুদ্ধ উদার আচরণে হয়ে যান মহামানব।
ভারতীয় উপমহাদেশে তিনজন ক্ষণজন্মা পুরুষের আর্বিভাব ঘটেছিল। যুগনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রথম দু’জনকে দেখিনি, তাঁদেরকে জানতে কিছু পড়াশোনা করেছি। প্রথমজনকে অনেকেই সন্ন্যাসী হিসেবে জানেন, মূলত এ পরিচয়টা খন্ডিত। তিনি ছিলেন অন্যতম রাজনৈতিক গুরু। তৎকালীন এক গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ ছিল যে, রামকৃষ্ণ মিশন কঠোরভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রাখলেও বিবেকানন্দের শিক্ষা এমন একটি ‘রামকৃষ্ণ পরিবেশ’ সৃষ্টি করেছেন যা ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে বিপদজ্জনক। মিশনের সেবাব্রত, আত্মবিশ্বাস ও আত্মত্যাগের আদর্শ যুবকদের দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছে। দেখা যাচ্ছে যে, যে সকল যুবকরা বিপ্লব ও আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে তাদের এক বড়ো অংশ এই ‘রামকৃষ্ণ পরিবেশে’ মানুষ হয়েছে। সুভাষচন্দ্র একই পরিবেশে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু মাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন-
‘আমি ভাবি-বাঙালি কবে মানুষ হইবে। কে বঙ্গমাতাকে উদ্ধার করিবে? কবে বাঙালি নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে শিখিবে?’ তখন তাঁর মনের মধ্যে প্রচ- দ্বন্দ্ব ও সংশয় চলেছে। ধর্মীয় আবেগ ও আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা, স্বদেশ-কল্যাণ চিন্তা, সমাজসেবার আদর্শ, দেশের বর্তমান দুরবস্থা ও প্রতিকারের পথ সবকিছু মিলিয়ে তাঁর মনে এক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার সৃষ্টি করেছিল। সব কয়টি চিন্তা ও লক্ষ্যের মধ্যে এক সমন্বয় ও সংযোগ স্থাপনের অনুভূতি তাঁর হলেও, তা তখনও তেমন গভীর ও সুদৃঢ় হয়নি। তাঁর ‘জীবন জিজ্ঞাসা’র সঠিক উত্তরের সন্ধান পান তিনি প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও বাণীতে, এভাবেই তিনি বিবেকানন্দের ‘মানসপুত্র’ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেন একজন দেশপ্রেমিক হিসেবে। তিনিই তো দেশবাসীর কাছে আকুলভাবে আবেদন করেছিলেন ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দেব’। আগেই উল্লেখ করেছি- আমি তাঁদেরকে দেখিনি, সামান্য পড়েছি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। আর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তাঁকে পড়ছি। বিগত দু’যুগ যাবত তাঁকে জানার জন্য তাঁর সম্বন্ধে লিখিত অনেক বই পড়েছি। এক জায়গায় এসে থেমে গিয়েছি। নেতাজী যেখানে দেশবাসীর কাছে ‘রক্ত’ চেয়েছিলেন, বিনিময়ে স্বাধীনতা এনে দিবেন, বঙ্গবন্ধু সেখানে সগর্বে উচ্চারণ করলেন- ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্’। নেতাজীকে তেমন করে কেউ রক্ত দেয়নি, তিনিও সেভাবে স্বাধীনতা এনে দিতে পারেননি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রক্ত দিয়েছেন, দেশকে মুক্ত করেছেন অর্থাৎ স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। আমার মনে হয়েছে এ এক পরম্পরা পরিক্রমা বা অভিযাত্রা। এই তিনজন ক্ষণজন্মা পুরুষ আজ নেই, কিন্তু তাঁরা অমর হয়ে আছেন। এই অমর সন্তানদের শেষোক্ত বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে, তাঁর জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই।
বঙ্গবন্ধু আপাতমস্তক রাজনৈতিক ব্যক্তি। আর রাজনীতির প্রথম পাঠ হলো ত্যাগ-স্বীকার। এই ত্যাগ হলো নিজেকে বিলিয়ে দেয়া, সেবাদর্শে নিজেকে উৎসর্গিত করা, ‘আমি’ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর জীবনী পাঠে, জনশ্রুতিতে রাজনীতির এই সংজ্ঞা শতভাগ প্রযোজ্য। এজন্য চলার পথে তাঁকে বহুমাত্রিকতায় নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-আদর্শ চলেছিল একই মহাসড়কের পথ ধরে।
রাজনৈতিক দর্শনের কথা শুনে থাকি, কিন্তু তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা করতে পারি না। পঠন পাঠনে অনুভূত হয়- এ এক বিশাল ক্ষেত্র এবং তার মধ্যে ধর্মনীতি, সমাজনীতি, কূটনীতি, শিক্ষানীতি, নৈতিকতা এবং নির্ভেজাল মানবপ্রেমের সকল অনুষঙ্গ বর্তমান। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রথম ও শেষ কথা সেবা এবং ত্যাগের বিনিময়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করা। শ্রীমদভগবত গীতায় কর্মযোগে বলা আছে, কর্ম করার অধিকার তোমার, ফল ভোগ করার প্রত্যাশা  কিছুতেই থাকবে না। তাকে বলা হয়েছে-‘নিষ্কামকর্ম’। রাজনৈতিক ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদরা আদর্শ যাপনে সারাজীবন কর্ম করে যান। তাঁদের চিন্তা-চেতনা, ধর্ম চর্চা সার্বজনীন, সমাজনীতি পরোপকার অভিধায় বিভূষিত, কূটনীতি মানবকল্যাণে কৌশল-স্বরূপ, শিক্ষানীতি চরিত্রগঠনের হাতিয়ার, অর্থনীতি বৈষম্যকে সমান্তরাল করার নীতি-আর্দশের নোটখাতা এবং সবকিছুই মানুষের কল্যাণের জন্য নিবেদিত। একজন রাজনীতিবিদ সামগ্রিকভাবে সবকিছুকে নীতি-আদর্শের কাছে বন্ধক রেখে বন্ধুর পথে চলতে হয়। জাগতিক পরিমন্ডলে পারিবারিকভাবে তিনি অনেকটা উপেক্ষিত, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যান আপন কর্মে। তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সার্বজনীন, কেউ বলেন জনপ্রিয়তা। এ অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপাতমস্তক একজন রাজনীতিবিদ।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তাঁকে নিয়ে যখন চিন্তা করি, তখনই উপর্যুক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন সম্পূর্ণভাবে একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ। আওয়ামীলীগ যখন প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে ২৩ জুন তারিখে, তখন তিনি জেলে ছিলেন। দলের নামকরণ করা হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পরবর্তিতে তিনি নানাভাবে নানা কৌশল অবলম্বন করে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিতে সক্ষম হন। দলটির নাম হয় ‘আওয়ামীলীগ’, ধর্মীয় পরিচয়ে রাজনীতির অঙ্গনকে তিনি প্রভাবিত করতে চাননি কোনোদিন। তাই দেখি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলনে ধর্মকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে চারটি স্তম্ভের উপর সংবিধান রচিত হয়, তার অন্যতম স্তম্ভ হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা করে বলেছেন-
‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়, বাংলার সাড়ে সাতকোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে, আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করব না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নেই, হিন্দুরা তাদের ধর্ম-পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রীষ্টানরা ধর্ম পালন করবে, তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না, আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস, .... যদি কেউ বলে যে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব ধর্মীয় অধিকার খর্ব হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি’। এবং স্পষ্ট ভাষায় দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন-
‘কেউ যদি বলে গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার নাই, আমি বলব সাড়ে সাতকোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে যদি গুটি কয়েক লোকের অধিকার হরণ করতে হয়, তা করতেই হবে’।
তিনি তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন-
‘২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরী, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এসব চলেছে’।
কাজেই ‘পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না’।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ এ শিরোনামে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। কারণ, তিনি আজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম আন্দোলন করেছেন। তিনি বলতেন-
‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। গণতন্ত্র- সেই গণতন্ত্র যা সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করে থাকে’।
যে গণতন্ত্র পুঁজিপতিদের প্রটেকশন দেওয়ার জন্য কাজ করে, শোষকদের রক্ষা করার জন্য গণতন্ত্রের কৌশল ব্যবহার করে, সে গণতন্ত্রে বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি বলেছেন-
‘আমরা চাই, শোষিতের গণতন্ত্র এবং সেই শোষিতের গণতন্ত্রের অর্থ হলো-আমার দেশে যে গণতন্ত্রের বিধিলিপি আছে তাতে যে সব বন্দোবস্ত করা হয়েছে যাতে এদেশের দুঃখী মানুষ রক্ষা পায়, শোষকেরা যাতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা নাই। সেজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সাথে অন্যের পার্থক্য আছে’।
তিনি স্পষ্ট ভাবেই বলেছেন যে কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রাষ্ট্র বা সরকার হাত দিবে না।
‘কিন্তু যে চক্র দিয়ে মানুষকে শোষণ করা হয় সেই চক্রকে আমরা জনগণের কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে চাই’।
সেজন্যই স্বাধীনতোত্তর ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স কোম্পানী, কাপড়ের কল, পাটের কল, চিনির কারখানা জাতীয়করণ করা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেছিলেন-
‘সব রকমের শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া এতো কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশে ধনীদের আরো ধনী হতে এবং গরীবদের আরো গরীব হতে আর দেওয়া হবে না। বাংলাদেশে কেউ না খেয়ে মরবে না। সবাই এদেশে সুখী ও তৃপ্ত জীবনযাপন করবে।’
বঙ্গবন্ধু সংবিধানে ‘সমাজতন্ত্র’ অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি’। সমাজতন্ত্রের মূল লক্ষ্য হলো শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেছেন- ‘আমাদের সমাজতন্ত্রের মানে শোষণহীন সমাজ। সমাজতন্ত্র আমরা দুনিয়া থেকে হাওলাত করে আনতে চাই না’। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন- ‘সমাজতন্ত্র ছাড়া বাংলার দুঃখী মানুষ বাঁচতে পারেনা’। তবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে ‘দেশের পরিবেশ দেশের মানুষের অবস্থা, তাদের মনোবৃত্তি, তাদের রাজনীতি, তাদের আর্থিক অবস্থা, তাদের মনোভাব, সবকিছু দেখে ক্রমশঃ এগিয়ে যেতে হয়। একদিনে সমাজতন্ত্র হয় না’। তবে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হলে সম্পদের সুষম বন্টন, একজন মানুষের ন্যূনতম সুবিধার বিষয়টি মনে রাখতে হবে। সুতরাং বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য সমাজতন্ত্রের কাঠামো সেভাবেই প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের এক নম্বর স্তম্ভ হলো জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধু বলেছেন-‘আমার বাংলার সভ্যতা, আমার বাঙালি জাতি,- এ নিয়ে হল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাংলার বুকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ থাকবে’। সেজন্য তিনি মনে করতেন, বিশ্বাস করতেন-যারা বাংলাদেশে নাগরিক হয়ে বসবাস করবে, তারাই বাঙালি হয়েই থাকতে হবে। মানবেন্দ্র লারমা আদিবাসীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক সুবিধা প্রত্যাশায় বঙ্গবন্ধুর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘তোরা বাঙালি হয়ে যা’। এমন কি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিহারী সম্প্রদায়কেও বাঙালি হয়ে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর এই উদার আহ্বান সাড়া না দেয়ায় নিজেরাই বিতর্কিত থেকে গেছে।
জাতীয়তাবাদী চেতনা একটি শক্তিশালী অনুষঙ্গ। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চরম মরণ সংগ্রামে। জাতীয়তাবাদ না হলে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। এই মূল নীতির উপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘আমরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। জাতীয়তাবাদের অনেক সংজ্ঞা আছে। অনেক ঋষি, অনেক মনীষী, অনেক বুদ্ধিজীবী, অনেক শিক্ষাবিদ এ সম্পর্কে অনেক রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন। সুতরাং এ সম্পর্কে আমি আর নূতন সংজ্ঞা নাইবা দিলাম। আমি শুধু বলতে পারি আমি যে বাংলাদেশের মানুষ, আমি একটা জাতি। এই যে জাতীয়তাবাদ, সে সম্পর্কে আমি একটা কথা বলতে চাই। ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সকলের সাথে একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভূতি। এই অনুভূতি যদি না থাকে, তাহলে কোনো জাতি বড় হতে পারে না এবং জাতীয়তাবাদ আসতে পারে না। অনেক জাতি দুনিয়ায় আছে, যারা বিভিন্ন ভাষাবলম্বী হয়েও এক জাতি হয়েছে। অনেক দেশে আছে একই ভাষা, একই ধর্ম, একই সবকিছু, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন জাতি গড়ে উঠেছে। তারা একটি জাতিতে পরিণত হতে পারে নাই। জাতীয়তাবাদ নির্ভর করে অনুভূতির উপর। আজ বাঙালি জাতি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এই সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল যার উপর ভিত্তি করে, এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে যার উপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ’।
এভাবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর একটি আদর্শিক প্রতিমূর্তি কল্পনা করতে পারি। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন বলেই বলতেন- ‘আমি আমার দেশবাসীকে ভালবাসি, দেশবাসী আমাকে ভালবাসে। এটাই আমার ‘ছঁধষরভরপধঃরড়হ ধহফ ফরংয়ঁধষরভরপধঃরড়হ’। সেজন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনায় বলতেন-
‘আমি যদি ভুলে যাই আমি বাঙালি, সেদিন আমি শেষ হয়ে যাবো। আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, বাংলার মাটি আমার প্রাণের মাটি, বাংলার মাটিতে আমি মরবো। বাংলার কৃষ্টি বাংলার সভ্যতা আমার কৃষ্টি ও সভ্যতা। এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ তোমাদের মনে রাখতে হবে’।
বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন যে তিনি দুঃখী মানুষের নেতা। তারাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। তিনি কোনোদিন হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয়কে জয় করতে চেয়েছেন- এই মহানুভবতাকে অনেকেই দুর্বলতা ভেবেছে, সুযোগও গ্রহণ করেছে। একটি বিপ্লবী সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার মুহূর্তে শত্রুপক্ষকে খতম করে দেয়। বাংলাদেশ সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই স্বাধীনতা লাভ করেছে। এ ক্ষেত্রে এরূপ একটা ঘটনা ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আদর্শিক সহযোগীরা এই হীন প্রচেষ্টায় পা বাড়াননি। এমন কি তখনকার যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আল-শামস, আল-বদর, জামাত শিবিরকে বন্দী করে মূলত তাদেরকে জনরোষ থেকে বাঁচানো হয়েছিল। আজ যদিও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, হচ্ছে; বঙ্গবন্ধু থাকলে বিষয়টি কীভাবে সমাধান হতো জানি না। দেখেছি, তিনি সংশোধনে বিশ্বাসী ছিলেন। বারবার তিনি অপরাধীদের সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। বিশাল অন্তঃকরণের এই মহীরূহ আপন ঔদার্যে  ক্ষমা করার মহান ব্রতে দীক্ষিত ছিলেন। নিজে অত্যাচারিত হয়েছেন, নির্যাতন ভোগ করেছেন, দেশের জন্য, দেশবাসীর মুক্তির জন্য জেলজুলুম ভোগ করেছেন, কিন্তু কোনোদিন প্রতিশোধের হিং¯্র অস্ত্রটি শাণিত করেননি। আজ এত বছর পর একথা ভেবে অবাক হই। তিনি যে সত্যিকার অর্থে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশের জাতির পিতা তা কোনো আবেগের স্বীকৃতি নয়, শ্রদ্ধা-গৌরবের স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির চিরকালীন নির্ভরতার অধিষ্ঠান।
যে রাজনৈতিক দর্শনে মানবিক চেতনাকে শাণিত করে কল্যাণপথে এগিয়ে নিবার আহ্বান জানায়- তা তো একজন ব্যক্তি তখন প্রতিষ্ঠান হয়ে যান। বঙ্গবন্ধু হলেন বাংলাদেশ ও বাঙালির চিরকালীন প্রতিষ্ঠান, তাঁর নীতি-আদর্শের অনুপম স্বাক্ষর হিসেবে এই সামাগ্রিকতাকে ‘মুজিববাদ’ বলেই স্বীকৃতি জানাতে চাই। মূল মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে দীক্ষায় আলোকিত হওয়ার একটি দিকনির্দেশনা। আর যিনি তা প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর যাপিত মতবাদই হলো ‘মুজিববাদ’।
রাজনৈতিক দর্শনে কূটনীতির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। একজন রাজনীতিবিদের দূরদৃষ্টি পরীক্ষা করা হয় তাঁর কূটনৈতিক চালের বা ছকের সার্থকতায়। কূটনীতি হচ্ছে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং অপরের সঙ্গে বন্ধুতা। বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়েই ঘোষণা দিলেন, কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, সহাবস্থানে মর্যাদার নিরিখে বন্ধুত্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন, এ নিয়ে কিছুটা সমালোচনা হয়েছিল। এটা ছিল মুসলিমদেশের সম্মেলন, আর বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সুতরাং এরূপ ধর্মীয় পরিচয়ের সম্মেলনে যোগদান করা ছিল আলোচনার বিষয়বন্তু। লক্ষণীয়, তখন বঙ্গবন্ধুকে শুধু আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাঁকে সম্মেলনে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন রাষ্ট্রপ্রধান এসেছিলেন। বিষয়টি দাঁড়িয়েছিল এরকম সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু না গেলে তা যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বঙ্গবন্ধুও দেখলেন এ সুযোগে বন্ধু সংখ্যা বাড়ানো দরকার। বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জন্য বন্ধুর দরকার, তিনি দেশের স্বার্থের কথা ভেবেই এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর কাছে আগে দেশের স্বার্থ, তারপর কূটনীতির মায়াজাল, গণতন্ত্রের যেমন প্রাথমিক পাঠ-সহনশীলতা, সহাবস্থান ও সহমর্মিতা, তেমনি কূটনীতি হলো বন্ধুত্বের মাধ্যমে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব সুদৃঢ় করা। এটি রাজনৈতিক দর্শনের একটি সহপাঠ। এভাবেই বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে জনকল্যাণে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এবং লক্ষ্য ছিল সুদূর প্রসারী। আজ পঞ্চাশ বছরের প্রাক্কালে এই সামগ্রিকতা বঙ্গবন্ধু হয়ে গেছেন আলোকবর্তিকা, তা দর্শনের ভাষায় আত্মগত যাপিত মতবাদ এবং ব্যক্তিমানসের স্বাতন্ত্রিক পরিচয়ে একটি তত্ত্বের জন্মদাতা। এই তত্ত্বটি হলো ‘মুজিববাদ’, যা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার পথ দেখাচ্ছে এবং এ পথ ধরেই উন্নত বাংলাদেশের অভিযাত্রা। এই অভিযাত্রার কান্ডারী হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি মুজিববাদের মহাসড়কে স্বাপ্নিক বাংলাদেশকে বাস্তবে রূপ দিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মনে হয় ২০৪১ বহুদূর, কাছের সময়টা ২০৩০-এ চলে আসবে, তা হলফ করেই বলা যায়। ‘মুজিববাদ’ কোনো অকাশি দৈববাণী নয়, একজন ক্ষণজন্মা পুরুষের জীবন সংগ্রামের আদর্শিক মতবাদ, জনকল্যাণের জন্য দিকনির্দেশনার দলিল এবং মূলমন্ত্র হলো- ‘জয় বাংলা’।





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};