ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
1396
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু বার্ডে
Published : Thursday, 15 August, 2019 at 12:00 AM
বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু বার্ডেআবুল কাশেম হৃদয়
১৯৭৫ সালের মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য বিভিন্ন জায়গায় মিলিত হয় খুনিরা। এর মধ্যে প্রথম গোপন বৈঠক করে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে যা কুমিল্লার বার্ড নামে সর্বাধিক পরিচিত। খুনিরা মিলিত হয় পৃথিবীর ইতিহাসে নিকৃষ্টতম বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক ও ভণ্ড খোন্দকার মোশতাক আহমদের কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়ার বাসায়। তাছাড়া কুমিল্লার চান্দিনা লে. কর্নেল অব. আবদুর রশিদ খোন্দকারের ঢাকার বাসায়ও বৈঠক করে ঘাতকরা। ঘাতকরা বৈঠক করে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সাথেও। ধুরন্ধর খোন্দকার মোশতাক আহমদকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খুব বিশ্বাস করতেন। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর বড় দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়েতে খোন্দকার মোশতাক হয়েছিল উকিল বাবা। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিতে সরকারি এটর্নি জেনারেল মাহাবুবে আলম প্রশ্ন রেখে বলেন-‘কত বড় বিশ্বাসঘাতক হলে এ মোশতাকই পাঁচ মাস পর বিপথগামী সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করতে পারে? কর্নেল রশিদ ও ফারুক আত্মস্বীকৃত খুনি। তাদের সাক্ষাতকার আছে। সানডে টাইমসে ছাপা হয়েছে। তাছাড়া কর্নেল রশিদ ও ফারুক হাইকোর্টে একটি রিটে খুনের কথা স্বীকার করে নিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষী ছিলেন কুমিল্লা জেলা আওয়ামীলীগের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক খোরশেদ আলম। তিনি জাতীয় সংসদে সদস্য ছিলেন। মামলার সাক্ষ্যে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পরে ১৯৭৪ সনের বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হয়। খাদ্যশস্য বিনষ্ট হয়। খাদ্যাভাব দেখা দেয়ার উপক্রম হয়। তখন কুমিল্লায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি বার্ডে বন্যা উত্তর কর্মসূচি নেয়া হয়। মাহবুব আলম চাষী বার্ড- এর পরিচালক হিসেবে ছিল। খন্দকার মোশতাক সাহেব তাকে এই পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করেন। সেই বন্যা উত্তর কর্মসূচি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায় এবং সেই কর্মসূচি স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি হিসেবে চালু হয়। আমি এই স্বনির্ভর কর্মসূচি কমিটির একজন সহ-সভাপতি ছিলাম। এই কর্মসূচির মিটিং বার্ড- এ হত।
১৯৭৫ সনের মার্চের শেষের দিকে কুমিল্লা বার্ডে খোন্দকার মোশতাক এবং মাহবুব আলম চাষীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন খোন্দকার মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, অধ্যাপক নূরুল ইসলাম, মাহবুব আলম চাষী এবং আমি নিজেসহ আরো অনেকে। সেই সম্মেলন তিন দিন চলে। দ্বিতীয় দিনের বিকালে বার্ডের রেস্ট হাউজের লাউঞ্জে বসে তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, দুইজন এমপি, আমি নিজে বসিয়া চা-পান করেছিলাম। তখন দেখলাম একটি আর্মি জিপে করে সিভিল ড্রেসে খন্দকার মোশতাক সাহেবের আত্মীয় মেজর খোন্দকার আঃ রশীদ এবং আরো একজন সামরিক অফিসার (বিএআরডি) রেস্ট হাউসে মোশতাক সাহেবের কক্ষে যান। মাহবুব আলম চাষী তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে নিয়ে ঐ কক্ষে যান। সেখানে প্রায় ৩০/৪০ মিনিট কাটান। তারপর মাগরিবের আগে ঐ সামরিক অফিসাররা চলে যান।
১৯৭৫ সালের মে/জুন মাসে খোন্দকার মোশতাকের গ্রামের বাড়ি এলাকায় একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট দেয়া হয়। ঐ টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় মোশতাক সাহেবের আমন্ত্রণে শিক্ষামন্ত্রী ইউসুফ আলী, চিফ-হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, আলী আশরাফ এমপি এবং আমি নিজে উপস্থিত ছিলাম। খেলা শেষে মোশতাক সাহেবের বাড়িতে চা-চক্রে যোগদান করি। চা-পানের সময় খন্দকার মোশতাক, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, শাহ মোয়াজ্জেম, বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন পলিসি ও কর্মসূচির সমালোচনা করেন। সেই সমালোচনায় শাহ মোয়াজ্জেমকে অত্যন্ত উৎসাহী এবং সোচ্চার দেখা গেল। মাঝে মাঝে বিভিন্ন সময়ে খন্দকার মোশতাককে বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন পলিসির ব্যাপারে বিদ্বেষমূলকভাবে কটাক্ষ করতে দেখা যায়।
তারপর ঐ সনের জুন/জুলাইতে দাউদকান্দি মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে মোশতাক সাহেব, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং আমি নিজে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। আলী আশরাফ এমপিও উপস্থিত ছিলেন। পরে মাহবুব আলম চাষীও আসেন। সেই সম্মেলন চলাকালে আর্মির জিপে মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ, মেজর ফারুক, মেজর শাহরিয়ার এবং আরো কয়েকজন সামরিক অফিসার আসেন। সম্মেলন শেষে খোন্দকার মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, মাহবুব আলম চাষী, মেজর রশীদ, মেজর ফারুক, মেজর শাহরিয়ার খন্দকার মোশতাকের বাড়িতে চলে যান। আমি সেখান থেকে কুমিল্লা চলে যাই।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামীদের বক্তব্য এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের রায়েও বেরিয়ে আসে কুমিল্লার বার্ডে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরুর কথা। ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল। এই ষড়যন্ত্র শুরু হয় ১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে। ওই বছরের মার্চে কুমিল্লার বার্ডের রেষ্ট হাউসে। এখানে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে কর্নেল সৈয়দ ফারুক ও কর্নেল খোন্দকার আবদুর রশিদসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা গোপন বৈঠক করেন। ঐ বৈঠকে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও সাবেক সচিব মাহাবুব আলম চাষী উপস্থিত ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার দাউদকান্দির দশপাড়ায় ও ৫৪ আগামসি লেনে খোন্দকার মোশতাক আহমদের বাসভবনে, গাজীপুরের সালনায়, লে. কর্নেল আবদুর রশিদের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় এবং লে. কর্নেল শাহরিয়ার রশীদের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় একাধিক বৈঠক হয়। সেই সব বৈঠকের পরিকল্পনা অনুযায়ি ১৯৭৫ সালের ১৪ আগষ্ট রাতে ক্যান্টমেন্টের বালুরঘাটে সৈনিকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান। ওই বক্তব্যের পরই বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার জন্য ট্যাঙ্কসহ সেনা সদস্যদের পাঠানো হয়।’
বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক রায়ে উল্লেখ করেন-‘বাদি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এটা প্রমাণ করেন যে, ১৯৭৫ সালের জুন/জুলাই মাসে দাউদকান্দিতে পরিবার পরিকল্পনার একটি সেমিনার শেষে খোন্দকার মোশতাকের সাথে কর্নেল রশিদ ও কর্নেল ফারুকের বৈঠক হয়। এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব মাহবুবুল আলম চাষী। ওই বৈঠকেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত হয়। এরপর আরও একাধিক বৈঠক হয়। এসব ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই খোন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রেডিওতে আসেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।’ রায়ের কর্নেল ফারুক রহমান, লে. কর্নেল অব. শাহরিয়ার রশিদ খান ও মহিউদ্দিন আহমেদের জবানবন্দি উল্লেখ করে বলা হয়, ‘মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। ১৫ আগস্টের আগেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও খোন্দকার মোশতাক আহমদের সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কর্নেল অব সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল অব. খোন্দকার আবদুর রশিদ ও মেজর অব. ডালিমের সাথে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও খোন্দকার মোশতাকের সাথে তারা যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। কর্নেল রশিদকে পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ করে খোন্দকার মোশতাকের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের বাসায় একটি বৈঠক হয়। এ বৈঠকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান এবং সাইফুর রহমান ও কর্নেল অব. আবদুর রশিদকে মন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবেই জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান করা হলেও কর্নেল রশিদকে মন্ত্রী করা হয় নি।’
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপিত মো: তফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের ৫ সদস্যের বিশেষ বেঞ্চে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানিতে অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেন, ‘কর্নেল অব. সৈয়দ ফারুক রহমান ও কর্নেল অব. খোন্দকার আবদুর রশীদের নেতৃত্বে পার্টি গঠন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই ফ্রিডমপার্টির চেয়ারম্যান কর্নেল অব. সৈয়দ ফারুক রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। মেজর অব. বজলুল হুদা এই ফ্রিডমপার্টির সেক্রেটারি হয়েছেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কর্নেল অব. খোন্দকার আবদুর রশিদ কুমিল্লার চান্দিনা আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ওই সংসদে তাকে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত করা হয়।’
(লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও দৈনিক কুমিল্লার কাগজের সম্পাদক)






© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};