ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
2471
ব্যাংকের ইতিহাসে পথিকৃত কুমিল্লায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা নেই কেন
রেজাউল করিম শামিম
Published : Sunday, 18 August, 2019 at 4:52 PM, Update: 08.09.2019 3:05:46 PM
ব্যাংকের ইতিহাসে পথিকৃত কুমিল্লায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা নেই কেনইতিহাসে ব্যাংক, ট্যাংক আর হুক্কা, খড়মের জন্যে প্রষিদ্ধ ছিলো কুমিল্লা। এ ঐতিহ্যর সাথে পরে যুক্ত হয় খদ্দর আর রসমালাই। সাম্প্রতিককালে এমনিতেই সারদেশ জুরেই ব্যাংকের অভাব নেই। কিন্তু সেই বৃটিশ-ভারতের সময় যখন তেমন কোন ব্যাংকই ছিলোনা। সে সময়ই কুমিল্লায় বেশ কিছু ব্যাংকের অস্তিত্ব ছিলো। কথাটি শুনলে অনেকেরই অবাক হওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাংকের ইতিহাস, ঐতিহ্য ঘাটলে এ সত্যই জ্বলজ্বল করছে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে, ১৯ শতকের প্রথম দিকেই কুমিল্লাতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়া চলে। ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পথিকৃত হচ্ছেন নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত। তাকে এখনো ভারতের ব্যাংকিং ক্ষেত্রে পথিকৃত বলা হয়। বলা হয় আধুনিক ব্যাংকে একজন লিজেন্ড। ‘সেন্টার ফর ষ্ট্যাডিজ অন স্যোসাল সাইন্স, কলকাতা’ নামের থিঙ্ক ট্যাংক খ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট গবেষক, ইন্দ্রজিৎ মল্লিকের একটি বিশাল লেখা রয়েছে নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত সম্পর্কে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে লেখাটি পেয়েছিলাম। সেখানে ‘ডেভলাপমেন্ট ব্যাংকার ফরম ব্যঙ্গল’ নামের ঐ লেখায় মি. দত্ত এবং সে সময়কার ব্যাংক ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। ঐ লেখায় দেখা যায়, মি. দত্ত পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। কুমিল্লার কালাকচুয়া (গ্রামটি সম্পর্কে লেখা আছে এ ভিলেজ অব ত্রিপুরা ষ্টেট) গ্রামে তার জন্ম হলেও তিনি থাকতেন কুমিল্লা শহরে। তাঁর শিশুকাল ছিলো অত্যন্ত কষ্টের। মাত্র নয় মাস বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। কষ্টকর তাঁর সেই শিশুকালেই তিনি লেখাপড়ার প্রতি মনোযোগী হন। কলেজ পেরিয়েই তিনি কলকাতা থেকে ল’পাশ করেন। এরপর কুমিল্লা ফিরে আসেন। কুমিল্লা সিভিল কোটে আইন পেশায় যুক্ত হন। সময়টি ছিলো ১৯১৪ সাল। সে সময় তিনি ছোট আকারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেন। সাইকেল চড়ে বিভিন্ন জনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকাপয়সা লেনদেন করতেন, হিসাবপত্র রাখতেন। পরবর্তীতে আদালতের জজ সাহেব, তাকে অনুমতি দেন আদালত অঙ্গনে তার ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে। সে অনুযায়ী আদালত ভবনের পাশে একটি ষ্টিলের শেড তৈরি করে তিনি সেখানে ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু করেন।
তা যাই হোক অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ‘কুমিল্লা ইষ্টার্ন ব্যাংকিং কর্পোরেশন’ নামে ব্যাংক চালু করেন মাত্র চারহাজার টাকা দিয়ে। সেই ব্যাংকটিই বর্তমানে কুমিল্লা কান্দিরপারে পূবালী ব্যাংক হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯১৪ সালে মি. দত্তের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক থেকে তিনি মাত্র ৮ টাকা ভাতা নিতেন। এরপর তার ছেলে বাতা দত্তও লেখাপড়া শেষ করে কুমিল্লা ফিরে এসে বাবার মতোই ব্যাংক ব্যবসা শুরু করেন । তার প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটির নাম ‘নিউ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এর মাঝে অনেক ঘটনা ঘটে। সেসব বর্তমান লেখায় প্রাসঙ্গিক নয়। প্রাসঙ্গিক হলো ১৯১৫ সালে এ দুটি ব্যাংক একিভূত হয়। পরবর্তীতে ‘ইউনিয়ন ব্যাংক’ নামে আরো একটি ব্যাংক কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠা পায়। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করেন ইন্দ্র ভূষণ দত্ত। ১৯১৯ সালে মহতœা গান্ধী এ ব্যাংকটি উদ্বোধন করেন। কিন্তু ব্যাংকটি বেশিদিন চলেনি। পরে এ ব্যাংকটিও কিনে নেন মি.দত্ত। এ ভাবে ব্যাংক ব্যবসায় মি.দত্ত ও তাঁর ছেলের অনেক প্রসার ঘটে। তারা ব্যবসার প্রয়োজনে চা-বাগানে বিনিয়োগ শুরু করেন এবং প্রয়োজনের তাগিদেই কলকাতা, মহারাষ্ট্র, গুজরাট বিভিন্ন স্থানে সম্প্রসারণ করেন তাদের কার্যক্রম। তারা আরো দুটি ব্যাংক একত্রিত করে ইউনিয়ন ব্যাংক অব ইন্ডিয়া স্থাপন করেন। যার কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে। শুধু তাই নয় ভারতের টাটা, বিড়লা, টিভিএস বিশেষ করে ওবেরিও চেইন হোটেলেও তাদের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত, মোর্টগেজ পদ্ধতি থেকে শুরু করে ব্যাংক ব্যবস্থার যেসব আধুনিক আইনকানুন তৈরি করে গেছেন, সেগুলো আজো ব্যাংক কার্যক্রমে সাফল্যের সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে। এজন্যই মি. দত্তকে ব্যাংকের পথিকৃত এবং লিজেন্ড হিসাবে সারা ভারতে সম্মান দেয়া হয়।
তাদেরই উত্তরসূতি হিসাবে সেসময় কুমিল্লায় সমবায় আন্দোলনেরও সূত্রপাত হয়। আর্থিক কর্মকা-ে সাহায্য সহযোগিতার জন্য সদস্য চাঁদা সঞ্চয়ের মাধ্যমে পুঁজি গঠনের ব্যবস্থা হিসাবে সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়।; যার অস্তিত্ব এখনো রয়েছে বিভিন্ন নামে। যেমন কুমিল্লা সমবায় ব্যাংক, পিপলস্ কোঅপারেটিভ ব্যাংক (বর্তমানে যা ভূমি উন্নয়ন ব্যাংক নামে; চালু রয়েছে), কুমিল্লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোঅপারেটিভ ব্যাংক (বর্তমানে সমবায় মার্কেট) ইত্যাদি। এগুলোর প্রতিষ্ঠাকাল হচ্ছে ১৯১৩ থেকে ১৯১৭। দু:খজনক হলেও সত্য, এই ব্যাংকে ইতিহাসে আদিস্থান কুমিল্লা হলেও দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ নামে পরিচিত। এর একটি শাখা আজো কুমিল্লায় স্থাপন করা হয়নি। এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর ধারনাও কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়। পাকিস্তান আমলের মাঝামাঝি সময় স্থাপিত হয় এই ব্যাংক। মুদ্রানীতি ঘোষণা, দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব-নিকাশ, ট্রেজারির কর্মকা- দেখভাল করা ইত্যাদি কাজগুলো এই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়ে থাকে। দেশে ব্যাংক ও তার শাখার ব্যপ্তি বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশ ব্যাংক; তার শাখা খুলেছে। বর্তমানে এর শাখার সংখ্যা দশটি।
কিন্তু এই তালিকায় কুমিল্লা নেই। দীর্ঘদিন থেকেই কুমিল্লতে একটি শাখা স্থাপন করার দাবিটি ছিলো। যেসব প্রাকযোগ্যতার ভিত্তিতে শাখা স্থাপন করা হয়ে থাকে, তার সবই কুমিল্লাতে বিদ্যমান। এসবের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বা রেমিটেন্স, যাকে প্রবাসী আয়ও বলা হয়। তাকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা স্থাপনের অন্যতম বিবেচনায় আনা হয়। সেক্ষেত্রে কুমিল্লা কিন্তু অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকেই দেখা গেছে যে, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে কুমিল্লা রয়েছে এক নম্বরে। গোটা দেশের মধ্যে কমিল্লার প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ সর্বোচ্চ। পরপর সাত বছর ধরেই এক নম্বর স্থানটি দখলে রয়েছে কুমিল্লার। তাছাড়াও ঢাকাসহ আশেপাশের জেলাগুলোর সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থাও অত্যন্ত উন্নত। কিন্তু তারপরও কুমিল্লায় একটি শাখা স্থাপন হচ্ছেনা কেন-তার উত্তর নেই। একটু খতিয়ে দেখলেই দেখা যায় যে, বগুড়ার চৌধুরী মোহম্মদ আলী কিছুদিনের জন্যে তৎকালীন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আর সে সুযোগে তিনি তার বাড়ি বগুড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা স্থাপন করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তা বহুবছর আগের ঘটনা। অথচ কুমিল্লারওতো অনেকেই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, এমপি, ক্যবিনেট সচিব, সচিব ছিলেন। দেখতে দেখতে ব্যাংকটির দশ দশটি শাখা হয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে কিন্তু কুমিল্লায় হচ্ছেনা।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রভাবশালী পরিচালক হচ্ছেন আমাদের কুমিল্লার কৃতী সন্তান আফতাবুল ইসলাম মঞ্জু। অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামালও কুমিল্লারই সন্তান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী কর্মকা-ে ওনাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুমিল্লা সদরের সংসদ সদস্য আকম বাহাউদ্দিন বাহার, একবার সংসদে জোড়ালো ভাবেই এ দাবিটি তুলে ধরেছিলেন। সাবেক রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিব এমপি এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সাথে অনেকবারই কথা বলেছেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মঞ্জু ভাইয়ের সাথে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে অনেকক্ষণ। ওনার গুলশানের অফিসে বসে কথা বলার সময় তিনি বলেন, অন্যান্য যেসব স্থানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শাখা রয়েছে, সেসব এলাকার চাইতে কুমিল্লাতে শাখা স্থাপন অনেক বেশি যৌক্তিক এবং যথার্থই হবে। তিনি বলেন, তিনি যেখানে যে অবস্থাতেই থাকেন না কেন, সুযোগ পেলেই কুমিল্লার জন্য কিছু করার আন্তরিক চেষ্টা করেন। তিনি এসএমইর চেয়ারম্যন থাকাকালীনও কুমিল্লাতে একটি প্রকল্প স্থাপনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। অনেকের অসহযোগিতার জন্যে তা শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি শাখা স্থাপনের ক্ষেত্রে কারো কোন আপত্তি থাকবে বলে মনে হয়না। তিনি জোর দিয়ে বলেন তিনি অর্থমন্ত্রীর সাথে এবিষয়ে কথা বলবেন। তাছাড়া কুমিল্লার প্রভাবশালী এমপি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথেও কথা বলবেন বলে জানান। কুমিল্লার ব্যাংকগুলোর অতীত জানতে গিয়ে জানা যায় যে, সমবায় ব্যাংক বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কো-অপারেটিভ ব্যাংক এবং ওরিয়েন্টাল কো-অপারেটিভ ব্যাংকে স্থাপন এবং পরবর্তীতে সেগুলো দখল হওয়ার হাত থেকে রক্ষার ক্ষেত্রে এডভোকেট আফজল খান আমাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি যখন বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন তখনো তিনি কুমিল্লাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের  একটি শাখা স্থাপনের বিষয়ে চেষ্টা করেছিলেন। এ প্রশ্নে যেকোন প্রয়োজনে তিনি সহযোগিতা করবেন বলে জানান।
এমনি প্রয়োজনীয় সব প্রাগযোগ্যতা থাকা সেইসাথে কুমিল্লার সন্তান অর্থমন্ত্রী, ব্যাংকের পরিচালকসহ প্রভাবশালী অনেক এমপি, উচ্চ পর্যয়ের কর্মকর্তা থাকা সত্বেও কুমিল্লার এই দাবিটি পূরণ হচ্চেনা। এর জন্য আর কি কি করা প্রয়োজন ?
লেখক; সিনিয়র সম্পাদক, দৈনিক খবর ও সাবেক সভাপতি-কুমিল্লা প্রেসকাব







© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};