ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
62
ইন্দিরার অন্তর্গত জীবনের কথা
Published : Tuesday, 3 December, 2019 at 12:00 AM
ইন্দিরার অন্তর্গত জীবনের কথাশান্তিরঞ্জন ভৌমিক ||
ইন্দিরার ১৬তম জন্মদিনের এক মাস আগে ফিরোজগান্ধী ইন্দিরাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ঠিক কীভাবে তিনি প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন, তা জানা যায়নি। ধারণা, সম্ভবত ইন্দিরা পুনেতে থাকার সময় ফিরোজ চিঠিতে বিয়ের প্রস্তাব দেন অথবা বোম্বে আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে এসে সেখান থেকে পুনে গিয়ে স্বশরীরে ইন্দিরাকে প্রস্তাব দিয়ে আসেন। ফিরোজের এ প্রস্তাব ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো।
এলাহাবাদের আনন্দভবনে কংগ্রেসের অনেক কর্মীর নিয়মিত যাতায়াত ছিল, ফিরোজও তাঁদের একজন। স্কুলে যাওয়ার সময় বাড়িতে ফিরোজকে বহুবার দেখেছিলেন ইন্দিরা।
ফিরোজের সঙ্গে কমলা ও নেহেরুর ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁকে তাঁরা ¯েœহ করতেন। তবে ফিরোজ ছিলেন কমলার একজন ভক্তের চেয়েও আরও কিছু বেশি। ব্যক্তি হিসেবে জওহরলালের সঙ্গে ফিরোজের খুব একটা মিল ছিল তা বলা যাবে না। দু’জনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো দু’জনেই ছিলেন খাটো। ফিরোজের উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ফুট ৬ইঞ্চি। তবে নেহেরুর মতো মাথায় টাক ছিল না। মাথা ভর্তি ঘোর কৃষ্ণবর্ণের চুল, হ্যা-সাম। তবে নেহেরুদের মতো অভিজাত ম্যানার্স অনুসরণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না। ফিরোজের মধ্যে কোনো বিশেষ সুকুমার প্রতিভা ছিল না। অবশ্য ইন্দিরাকে তিনি বলেছিলেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও ফুল তাঁর প্রিয় বিষয়। অনেকে তাঁকে নিরস ও কাঠখোট্টা, আবার কেউ কেউ তাঁকে দিলখোলা লোক মনে করতেন। তবে তিনি যে ভোগবাদী মানুষ ছিলেন, বাহারী খাবার, মদ ও যৌনতার বিষয়ে তাঁর যে আগ্রহের কমতি ছিল না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
ফিরোজ হয়তো অনেক আগেই ইন্দিরাকে বিয়ে করার বিষয়ে মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু তিনি যখন বিয়ের প্রস্তাব দেন তখনও ইন্দিরা বিয়ের জন্য উপযুক্তপূর্ণ যৌবনা হননি। তবে ইন্দিরার বিয়ের বয়স অথবা অন্য যে কোনো কারণেই হোক ফিরোজের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলো। ইন্দিরা এবং কমলা কৌশলী ভঙ্গিতে ফিরোজকে জানিয়ে দিলেন যে বিয়ে করার মতো বয়স ইন্দিরার এখনও হয়নি, এবিষয়টি জওহরলাল নেহেরু জানতেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। বয়সটাই যে প্রত্যাখ্যানের মোক্ষম কারণ হতে পারে তা হয়ত নয়। কমলার যখন বিয়ে হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬, নেহেরুর ২৬, মজার ব্যাপার হলো, ফিরোজ প্রস্তাব দেওয়ায় মাত্র কয়েকদিন পরই গান্ধী এক চিঠিতে নেহেরুকে বলেছিলেন ইন্দিরার জন্য তিনি একটা ভালো পাত্রের সন্ধান পেয়েছেন, সময়টা ছিল ১৯৩৩ সাল।
সারাজীবনভর ফিরোজকে নারীঘেঁষা প্রকৃতির মনে হলেও ভোওয়ালিতে কমলার সেবা শুশ্রুষা করার সময় তাঁর সঙ্গে কমলার সম্পর্কের একটি মধুর দিক প্রকাশিত হয়েছে। ফিরোজের প্রতি কমলার দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব তখনো অস্পষ্ট। ফিরোজের সঙ্গে কমলার সম্পর্ক নিয়ে অপপ্রচার ছড়িয়ে ছিল তা ইন্দিরার কানে সে সময়ে বা তারপরে যখনই যাক তা তিনি বিশ্বাস করতেন না।
ভোওয়ালিতে স্যানাটোরিয়ামে মৃত্যু আর মুমূর্ষদের আর্ত চিৎকারে ভারী পরিবেশের মধ্যে ফিরোজের সঙ্গে কয়েকদিন কাটানোয় ইন্দিরা তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ পেয়েছিলেন। ইন্দিরা যেমন তাঁর মাকে ভালোবাসতেন তেমনই কমলাকে শ্রদ্ধা করতেন ফিরোজ। অসুস্থ কমলার পাশে ফিরোজ নিঃস্বার্থভাবে সময় দিয়েছিলেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ছিলেন হ্যা-সাম ও সহানুভূতিশীল। ভোওয়ালিতে খুব কাছাকাছি থাকার কারণে ফিরোজ সম্পর্কে ইন্দিরার ভালো ধারণার জন্ম হয়। এক পর্যায়ে তাঁর মনে হয় ফিরোজের ওপর নির্ভর করা যায়। তাঁকে বন্ধু ভাবা যায়।
সাময়িক মুক্তি পেয়ে ১৯৩৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভোওয়ালি স্যানাটোরিয়ামে কমলা ও ইন্দিরার সঙ্গে দেখা করতে নেহেরু আসেন। সেখানে ফিরোজও ছিলেন। নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে থার্টি ফার্স্ট নাইটে নেহেরু তাঁদের সঙ্গে সারারাত গল্পগুজব করে কাটান। পরদিন অর্থাৎ ১৯৩৫ সালের ১জানুয়ারি আবার আলমোড়া জেলে নেহেরুকে ফিরে যেতে হয়। জেলে ফিরে গিয়ে সেদিনই তিনি ডায়েরিতে লেখেন-
‘গতকালের মতো এমন মধুর ও সুন্দর সময় আমি (কমলার সাথে) কমই কাটিয়েছি। আমরা সারারাত অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেছি। আমাদের দু’জনের প্রতি দু’জনের যে এত টান রয়েছে তা আমি আগে এতখানি উপলব্ধি করতে পারিনি। আমরা যেন নতুন করে দু’জন দু’জনকে চিনতে পেরেছি। শান্তিনিকেতনে গিয়ে ইন্দিরার জন্য ভালোই হয়েছে। তাকে বেশ প্রাণবন্ত মনে হচ্ছে। আর ফিরোজের ক্ষমতা আছে বলতে হবে। ও না থাকলে এ ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলানো অসম্ভব হতো। ফিরোজ এবং নার্স ছাড়া কমলার এখন তো বলতে গেলে কথা বলারও লোক নেই।’
এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করতে চাই- ইন্দিরার জন্য উপযুক্ত পাত্র কি ফিরোজ? যাকে গান্ধীজী নির্বাচন করে নেহেরু-কমলাকে জানিয়েছিলেন?
অন্যপ্রসঙ্গ
১৯৩২ সালে কমলার শরীর ভেঙ্গে পড়ে। তিনি ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই বছরের অধিকাংশ সময় তাঁকে চিকিৎসার জন্য বাড়ি ছেড়ে বোম্বে। তারপর কলকাতায়। কলকাতায় থাকাকালীন কমলা রামকৃষ্ণের ধর্মের দিকে ঝুকে পড়েছিলেন। ১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি কমলার বিশেষ চিকিৎসার জন্য নেহেরু ও কমলা কলকাতায় আসেন। এর পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন পরিদর্শনও তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি নেহেরুকে এলাহাবাদ থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। নেহেরুর কাছাকাছি থাকার জন্য কমলা এবং তাঁর শাশুড়ি স্বরূপরাণী কলকাতায় চলে আসেন। এই সময়টাকে কমলা প্রতিদিন রামকৃষ্ণ মিশনে যেতেন এবং নিয়মিত ধর্মচর্চা করতেন। কলকাতায় তখন বেশ গরম পড়েছিল। কষ্ট হলেও কমলা ও স্বরূপরাণী বাসায় ফ্যান ব্যবহার করতেন না। কারণ, জেলখানায় নেহেরুর জন্য ফ্যানের ব্যবস্থা ছিল না। সে সময় অর্থাৎ এপ্রিলে ইন্দিরার ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা শেষ হলে বোম্বে থেকে কলকাতায় কমলার কাছে চলে আসেন। এখানে এসে তিনি বেশির ভাগ সময়ই মায়ের সঙ্গে রামকৃষ্ণ মিশনে ছিলেন এবং আলীপুর জেলে বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতেন।
১৯৩৫ সালের জানুয়ারিতেই নেহেরু দ্বিতীয়বারের মতো স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এসে কমলাকে পুরোপুরি পাল্টে যেতে দেখে বড় ধরনের ধাক্কা খান। এসময় কমলার মধ্যে তিনি আকাশপাতাল পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। কমলার উদাস ও নির্লিপ্তভাব দেখে নেহেরু ভেবেছিলেন অসুস্থতার জন্য তিনি ঠিকমতো নিজেকে প্রকাশ করছেন না। কিন্তু পরে তাঁর কথা শুনে নেহেরু রীতিমত থ মেরে গেলেন। তিনি নিজেই বলেছেন-
‘কমলা ঈশ্বরের সাধনায় ডুবতে চাইছিলেন। ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে চাইছিলেন। তাঁর এই দর্শনিক পরিবর্তন আমাদের সম্পর্কের মাঝখানে এক নির্লিপ্ত শীতলতা নিয়ে এসেছিল। বিষেশত আমি যেহেতু ঈশ্বরে বিশ্বাসী নই সেহেতু সংকট আরও বেশি তৈরি হয়েছিল।’
কমলা জানিয়েছিলেন- তিনি ব্রহ্মাচর্যব্রত গ্রহণ করেছেন এবং সে কারণেই তিনি আর স্বামী সহবাস করবেন না।
কমলার এই ধর্মীয় ব্রত নেহেরুকে তিক্তবিরক্ত করে তুললো। প্রথমত, নেহেরু নিজে ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, কমলার ধর্মচর্চা তাদের স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এটা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি, জেলে ফিরে গিয়ে ডায়েরিতে লেখেন-
‘আমি বুঝতে পারছি- কমলা আমার জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গতা আমাকে তাড়া করছে। অকূল সমুদ্রে ভেলাহীন অসহায়ের মতো আমি ভেসে চলেছি। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছি।’
পরে কমলা তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর কাছে চিঠিতে লেখেন-
‘তিনি (জওহরলাল) আমার ওপর চটে আছেন। এখন ভগবান ছাড়া আমার সহায় বলতে কেউ নাই। এ জগৎ এক মায়া জাল, এ জালে যে যত জড়াবে সে তত দুঃখ ভোগ করবে। সংসারী হিসেবে, গৃহিণী হয়ে জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে অনেক বড় ভুল করেছি। আগেই যদি এ সত্য বুঝতে পারতাম, ঈশ্বরের সন্ধান করতাম, তাহলে এতদিনে নিশ্চয়ই তিনি দেখা দিতেন।’
এ যেন রামকৃষ্ণ-ভাবনা এবং উপলব্ধি। ব্রহ্ম সত্য জগত মিথ্যা।
১৯৩১ সালের এপ্রিল মাসে বাবা-মায়ের সঙ্গে ইন্দিরা গাড়ি করে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ব্যা-ি যাচ্ছিলেন, সঙ্গে একজন আয়া এবং জওহরলালের একান্ত পরিচারক হরিলাল। মতিলালের মৃত্যুর পর দুঃসহ যন্ত্রণার হাত থেকে কিছুটা সময়ের জন্য রক্ষা পাওয়ার আশায় নেহেরু-পরিবার ছুটির দিনটা শ্রীলঙ্কায় কাটাতে এসেছিলেন। এদিকে ইংরেজদের সঙ্গে সমঝোতা হিসেবে রাজবন্দীদের মুক্তি ও গ্রামবাসীদের লবণ তৈরির অনুমতির বিনিময়ে গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যহারের ঘোষণা দেন। নেহেরু কোনোভাবেই এটা সমর্থন করেননি। সেজন্য রাজনৈতিক আপস আর ব্যক্তি জীবনের অসহনীয় কষ্ট থেকে পালানোর জন্যই নেহেরু ইন্দিরা ও কমলাকে নিয়ে শ্রীলঙ্কা আসেন। শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন বৌদ্ধমূর্তি, পুরোনো দুর্গ, প্রাসাদ ও মন্দির তাঁরা ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, গত ১৬ বছরের বৈবাহিক জীবনে তাঁরা একজন আরেকজনকে যতটা না চিনতে পেরেছিলেন, একজন আরেকজনকে এখানে এসে যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন, বিস্মিত হয়েছিলেন। বাবা-মায়ের এই নতুন ঘনিষ্ঠতাকে ইন্দিরা কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন? এ সময়-ইন্দিরা বাবা-মার চারপাশে অবিরাম চক্কর খেয়েছেন। বাবা-মার ঘনিষ্ঠতাকে নতুন করে আবিষ্কার করার পর স্বাভাবিকভাবেই তিনি ছিলেন প্রাণোচ্ছল। ৪২ বছরের নেহেরুর মাথায় চুল পড়ে গিয়েছে, মনে হলো পঞ্চাশোর্ধ একজন। ৩৪ বছরের কমলাকে দেখে মনে হতো তাঁর বয়স সর্বোচ্চ পঁচিশ বছর। অন্যদিকে ১৪ বছরের ইন্দিরা উচ্চতায় তখন তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁকে কমলার ছোট বোনের মত মনে হতো। নেহেরু একবার তাঁর বোনকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘লোকজন প্রায়ই কমলাকে আমার কন্যা বলে ধারণা করছে। ইন্দিরা যে কমলারই গর্ভজাত মেয়ে প্রথমে কেউ তা বিশ্বাসই করতে চায় না। ব্যাপারটা একবার দুইবার নয়, প্রতিদিনই ঘটেছে।’
১৪ বছর বয়সী ইন্দিরা তখন অনেক কিছুই বুঝেন। বয়স অনুযায়ী তাঁর উচ্চতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বেশ রোগা গড়নের শরীরে তাঁর নাকটা ছিল লম্বা। তার ওপরে গায়ের রং কিছুটা কালো মতোন হওয়ায় তিনি দেখতে কিছুটা ‘অসুন্দর’ ছিলেন। সেজন্য তিনি তাঁর শারীরিক গঠন ও সৌন্দর্য নিয়ে উদ্বেগে থাকতেন এবং নিজেকে অনেকটা আড়াল করে রাখতে চাইতেন।
কয়েকদিন লঙকাপুরীতে কাটিয়ে দক্ষিণ ভারত হয়ে অবশেষে এলাহাবাদ ফিরলেন। এই পরিক্রমায় ইন্দিরাকে সবচেয়ে বেশি মর্মাহত করেছিল, সেটি হল বর্ণ-বৈষম্য। আনন্দভবনে বেশ কয়েকজন চাকর ছিলেন যারা ছিলেন হরিজন (মেথর) সম্প্রদায়ভুক্ত। হরিলালও একজন হরিজন। বিভিন্ন এলাকা বেড়ানোর সময় বিভিন্ন দোকানপাট ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এখানে হরিজনদের প্রবেশ নিষেধ’ অথবা ‘ব্রাহ্মণদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা।’
১৯৩১ সালের মে মাসে ইন্দিরাকে বোম্বের দক্ষিণে অবস্থিত পুণের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্কুলটির নাম ‘পিউপিলস ওন স্কুল’। ভকিল পদবী যুক্ত এক পার্সী দম্পতি স্কুলটা চালাতেন। স্বামী জাহাঙ্গীর ভকিল, স্ত্রীর নাম কুনভার বাঈ। তাঁরা পরিণত বয়সে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছেন। শান্তিনিকেতনের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই এই দম্পতি কংগ্রেস কর্মীদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শেখানোর উদ্দেশ্যে পুণেতে এ স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেন। স্কুলের সকল ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা খদ্দরের ড্রেস পরে স্কুলে আসতেন। শান্তিনিকেতনের আদলেই শিক্ষার্থীরা স্কুল ভবনের পাশের বাগানে গাছের নীচে বসে পড়াশোনা করতেন। কয়েক মাস বাদে কমলা জওহরলালকে চিঠিতে জানালেন, তাদের দু’জন থেকে বিছিন্ন হয়ে ইন্দিরা একেবারে মুষড়ে পড়েছেন। এ চিঠি পড়ে নেহেরু ইন্দিরাকে লিখলেন-
‘তোমার মন খারাপ করার কোনও কারণ নেই, মাঝে মাঝে তোমার একা মনে হতে পারে। আমাদের সবারই এমন হয়। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই আমাদের হাসিখুশি থাকতে হবে।’
১৯৩৪ সালে ইন্দিরা যখন শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন, তখন রবীন্দ্রনাথের অর্থাৎ ‘গুরুদেবের’ বয়স ছিল ৭৩ বছর। ওই সময় রবীন্দ্রনাথের বহু ভারতীয় ও ইউরোপীয় ভক্ত ও অনুসারী ছিল। অনেকেই তাঁকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন ঋষিপুরুষ মনে করতেন। ইন্দিরা লিখেছেন-
‘মাথাটা সামনের দিকে ঝোঁকানো। শ্বেতশুভ্র দীর্ঘ চুল ও দাঁড়ি হালকা বাতাসেও ফুরফুর করে উড়তো। প্রশস্ত কপালের নীচে অতলস্পর্শী দুটো চোখ মেলে তিনি মোহনীয় ভঙ্গিমায় তাকাতেন। তাঁর চেহারার সৌন্দর্য ও শারীরিক গড়ন ছিল একজন সত্যিকারের রোমান্টিক কবির প্রতিচ্ছবি।’       
৭ জুলাই ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে আসলেন। পিতাকে চিঠিতে লিখলেন-
‘অবশেষে শান্তিনিকেতনে পৌঁছেছি। এখানকার সব কিছুই সুন্দর, শিল্পসম্মত আর প্রকৃতি ঘেঁষা।
উপলব্ধির কথা বলেছেন-
‘এখানে এসেই প্রথমবারের মতো তিনি জটিল রাজনৈতিক কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ থেকে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও রেহাই পেয়েছিলেন।’...
লিখেছেন-
‘শান্তিনিকেতনে এসে আমি একটা সত্যিকারের শান্তি পরিবেশ পেলাম যার মাধ্যমে আমি আমার ভেতরকার ঘৃণা বিদ্বেষের বিষ ধুয়ে মুছে ফেলতে পারলাম। ... শান্তিনিকেতনের কাছ থেকেই আমি শিখেছি কী করে বাইরের কোলাহল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এ শিক্ষা আমাকে সারাজীবন সাহায্য করেছে।’
শ্রীভবন আশ্রমের গালর্স হোস্টেলে পাথরের মেঝেওয়ালা একটা পাকা ঘরে অন্য তিনজন ছাত্রীর সঙ্গে থাকতেন ইন্দিরা। মেঝের ওপর মাদুর বিছিয়ে তাঁরা ঘুমাতেন। বালতিতে ঠা-া জল তুলে ¯œান করতেন। এছাড়া তাঁকে ঘর থেকে একটু দূরের একটা বাথরুম ব্যবহার করতে যেতে হতো।
সেখানে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। ভোর সাড়ে ৪টায় শয্যা ত্যাগের বেল বাজানো হতো। ঘুম থেকে উঠেই নিজের হাতে তাদের বিছানা-বালিশ গুছিয়ে, ¯œান সেরে রান্না করতে হতো। ভোরের নাস্তা সেরে ঘর দোর ঝাড় দিয়ে সাড়ে ৬টার মধ্যে কাসে যেতে হতো। কাস শুরু হওয়ার আধ ঘন্টা আগে সবাইকে ধ্যানে বসতে হতো। এছাড়া প্রার্থনা সঙ্গীতও গাওয়া হতো। শান্তিনিকেতনে সবাইকে খালি পায়ে কাসে আসতে হতো। শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এ নিয়ম ব্যত্যয় ছিল না।
ইন্দিরা সবচেয়ে প্রিয় ছিল নাচের কাস। ভারতীয় প্রাচীণ শাস্ত্রীয় নৃত্যগুলোর মধ্যে মণিপুরী শেখার সময় ইন্দিরার সবচেয়ে বেশি ভালোলাগত। তিনি দ্রুত এ বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই তিনি স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এছাড়া একই সঙ্গে তিনি সঙ্গীত, ভাস্কর্য, চিত্রকলা ও নানা ধরনের খেলাধূলার সঙ্গে যুক্ত হন। ভারতীয় ও ইউরোপীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে তিনি অল্পসময়ের মধ্যে দক্ষতা অর্জন করেন। তবে নাচের প্রতি তাঁর আগ্রহটা ছিল বেশি।
শান্তিনিকেতনে শাড়ী পরে কাসে যেতে হতো। সেই সুবাদে শাড়ি সম্পর্কে তাঁর বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ইন্দিরা শাড়ি পরে কাটিয়েছেন। ভারতবর্ষের গণমানসে তাঁর সেই শাড়িপরা অপূর্ব মূর্তি পরম শ্রদ্ধায় গ্রহণ করেছিল।
নেহেরু ইন্দিরার পড়াশোনার খবর নিতেন, উদ্বিঘœ থাকতেন। চিঠিতে লিখেছেন- ‘তোমার এগজামিনেশন পেপার সরাসরি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেবে। ওগুলো আমার দেখা দরকার। ... বাঙালি মেয়েদের মতো অলস হয়ো না।’
অন্য চিঠিতে লিখেছেন-
‘তোমাকে শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় দেখে এসেছি। এ কারণে দুশ্চিতায় আছি। প্রতিদিনকার সাধারণ ব্যায়াম করা কখনও ছাড়বেনা। শারীরিক ফিটনেস না থাকাটাকে আমি বড় ধরনের অপরাধ, এমনকি পাপ হিসেবে মনে করি।’   
শুনেছি, নেহেরু মৃত্যুর আগে ও নিয়মিত আধাঘন্টা শীর্ষাসন করতেন, অর্থাৎ মাথা নীচে রেখে পাগুলো উপরে তুলে রাখতেন।
ইন্দিরা শান্তিনিকেতনে থাকতেই মা কমলার অসুস্থতার বিষয় নেহেরুর টেলিগ্রামে জানতে পারেন, টেলিগ্রামটি ছিল গুরুদেবের নামে এবং ইন্দিরাকে যথাশীঘ্র পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধ। কলকাতা হয়ে ইন্দিরা ভোওয়ালিতে মায়ের কাছে এলেন, সপ্তাহ খানেক পর নেহেরুকে গুরুদেব লিখেছেন-
‘ইন্দিরাকে অশেষ আর্শীবাদ করে বিদায় জানিয়েছেন। সব শিক্ষক-শিক্ষিকা তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সে ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। তাই সে কাজ শেষে আবার শান্তিনিকেতনে ফিরে আসবে আমি তাই প্রত্যাশা করি।’
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আশা পূরণ হয়নি। এখানেই ইন্দিরার জীবনে শান্তিনিকেতন অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়।






© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};