ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
85
আরেক পার্বণ নয়, দরকার বোধের মিলন মেলা
Published : Wednesday, 12 February, 2020 at 12:00 AM
আরেক পার্বণ নয়, দরকার বোধের মিলন মেলাস্বদেশ রায় ||
কারও জন্যে বই মেলা আসে এক মাস, কারও জন্যে বারো মাস। নতুন বইয়ের গন্ধ, নতুন কোনও বই পৃথিবীর কোনও কর্ণারে আবেদন তুললেই সে বই না জোগাড় করতে পারলে ভালো লাগে না অনেকের। কিনডেল, আই প্যাডে, স্মার্ট ফোনে বই পড়ছি, তারপরও  কাগজের পাতায় ছাপানো, শক্ত বাইন্ডিংয়ের একটি বই অন্য কী যেন এক আবেদন আনে। সে আবেদন ভাষায় প্রকাশ করাও কষ্ট। হয়তো বা হতে পারে হাজার হাজার বছরের জেনেটিক্যাল বিষয় যা অভ্যাসকে গাঢ় করে। ভালোবাসা আর অভ্যাসের ভেতর পার্থক্যটা সুক্ষ্ম একটি সুতোয়। পার্থক্য রেখা টানা যায় না। কত যে জীবন পার হয়ে যায় মানুষের অভ্যাসকে ভালোবাসা মনে করে।  আর কোনও কোনও ভালোবাসা অভ্যাসে পরিণত হতে নেয় বিচিত্র কোনও রূপ।
বই পড়ার মধ্যেও তেমনি ভালোবাসার বই পড়া আছে আবার অভ্যাসে বই পড়া আছে। অভ্যাসের বই পড়া এক ধরনের সময় কাটানো, সেখানে প্রতিদিনের সাধারণ কাজের সঙ্গে একটা মিল আছে; অন্যদিকে ভালোবাসার বই পড়া অন্য এক জগতের বিষয়। সে মুহূর্তগুলো কখনো এই জম্মের প্রিয়ার মুখ কখনো বা গত জম্মের প্রিয়ার মুখ। যাকে ভেবেই সব থেকে বেশি তৃপ্তি। অর্থাৎ যা পড়ায় কম, ভাবায় বেশি। যেমন ধরুন, এক তরুণ কোনও এক গভীর রাতে হিনির একটি কবিতা পড়ে আর ঘুমোতে পারেনি। শুধু এক রাত নয় অনেক রাত তার কেটে গিয়েছিল নির্ঘুম। এক কিশোর হয়তো জীবনানন্দের একটি কবিতা পড়ে মধ্য রাতে চলে গিয়েছিল অগ্রাহায়ণের বিলে। নিজেকে একটি শিশির ভেজা ইঁদুর ভেবে ঘুরে ছিল সারা রাত। তারপরে জীবনের মধ্যাহ্নে এসে কোনও এক গভীর রাতে বা জীবনের জটিল কাজের সময়ে সে বুঝতে পারে আসলে কোথায় বাস করে শিশির ভেজা ইঁদুরের জীবন। সে ভাবে এই যে জীবনের কৈশোর থেকে মধ্যাহ্ন অবধি একটি লাইন তার মাথার কোষে কোষে খেলা করেছে একেই মনে হয় ভালোবাসা বলে চিহ্নিত করা যায়। শেষ অবধি ভালোবাসার স্থান তো মাথার কোটি নিউরনের মাঝে।
অর্থনীতির কোনও কোনও বই, বিজ্ঞানের কোনও কোনও বই রবীন্দ্রনাথ রাতের পর রাত জেগে পড়তেন, তা উঠে এসেছে তার কবিতায় তার গানে। পৃথিবীর কেন্দ্রের চুম্বকের দোলাকে গানে তুলে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ। ভালোবাসার কোষ বেয়েই মনে হয় বইয়ের অক্ষরে স্থির থাকা জ্ঞান এমনিভাবেই সচল হয়। তাই বই বড়ই শান্ত, বড়ই স্থির। বই প্রকাশে, বই লেখায় একটা ধ্যানযোগ কাজ করে সব সময়ই। আর এখানে একটা মিল থাকা দরকার, একমাস যাদের বই মেলা তাদের ক্ষেত্রেও সারা বছর যাদের বই মেলা তাদের মতো একটা ধ্যানযোগ বড়ই দরকার। লেখকের ধ্যানই কিন্তু পাঠককে ধ্যানী করে তোলে। আর যখন লেখক পাঠকের ধ্যান একই সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়, তখন সেটা ওই ব্যক্তির জন্যে, অর্থাৎ ওই পাঠকের জন্যে এক মহালগ্ন। এই মহালগ্নে পৌঁছানোর জন্যে লেখক ও পাঠককে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। পৃথিবীতে  অনেক কিছুর জন্যে সোজা রাস্তা আছে বা তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তি অনেক কিছুকে সহজ করে দিয়েছে বা দিচ্ছে কিন্তু ওই মহালগ্নে পৌঁছানোর জন্যে কোন প্রযুক্তি কোনোদিনই কাজ করবে না। প্রযুক্তি একটি কবিতার বইয়ের অবয়বকে সুন্দর করছে কিন্তু ওই মহালগ্ন ছাড়া কোনও কবিতা হোমারের স্বর্ণময় জগতে নিয়ে যায় না, নিয়ে যায় না নিস্তব্দ এক পাঠককে আরও নিস্তব্দ সন্ধ্যায় কর্ণের কাছে কুন্তীর আবেদনের সেই নীরবতায়।
কুন্তীর এই নীরবতা আমাদরে জীবনে বড়ই কম। বরং আমরা উৎসব প্রিয় জাতি। আমাদের এই বদ্বীপের বাংলায় বারো মাসে তের পার্বণ ছিল বলা হয়। এই বাংলা থেকে ১৯৪৭ সালে যারা বিতাড়িত হয়েছে তাদের বেশ কিছু মানুষ বাস করে কলকাতার গড়িয়াহাট এলাকায়। সেখানে দেখা যায় একটা রেস্তোরাঁর নাম তেরো পার্বণ। অর্থাৎ ব্যবসার ভেতরেও তার পার্বণকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা।তবে সত্যি সত্যি ইতিহাসের নানান গলিতে খুঁজলে দেখা যাবে এই নদী পাড়ের, এই হাওরের পানির ভেতর বেড়ে ওঠা বাঙালির পার্বণের অন্ত নেই। কয়েক কিলোমিটার পার হলেই দেখা যায় নতুন নতুন পার্বণের। সে সব দেখলে, বাঙালির ইতিহাস পড়লে মনে হয়, আসলে এ জাতি তার সব কিছুকে পার্বণে পরিণত করতে পারে। তাই এখন যখন এ গ্রাম বাংলার কিছু মানুষ ইট পাথরের শহর তৈরি করে নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করছে, তখন নাগরিক জীবনেও সে নিয়ে আসতে চায় নানাভাবে তার পার্বণকে। ষাটের দশক থেকে সনজিদা খাতুন, ওয়াহিদুল  হক, নওয়াজেশ আহমেদ প্রমুখের চেষ্টায় এই নগর গড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরে পহেলা বৈশাখ এক নাগরিক নান্দনিকতায় সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে এসে তা বেশ বড় উৎসব হতে শুরু করে। এমনকী নগরের সব কিছুর নিয়ম অনুযায়ী নগর থেকেই সে উৎসব ছড়িয়ে যেতে শুরু করে গ্রামে-নগরের নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে।  সেখানে মননেরও যোগ হতে শুরু করে শিল্পের নানান পথের হাত ধরে। গত কয়েক বছরে তা আবার নিরাপত্তা প্রহরীর ঘেরায় পড়ে গেছে কট্টর ধর্মীয় মৌলবাদীদের চাপে।
সত্তরের দশক থেকে বইকে ঘিরে একটি পার্বণের রূপ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে এই নগর জীবনে। তবে এটা শুধু পার্বণ নয়, পহেলা বৈশাখ নয় বরং ওই তেরো পার্বণ হোটেলটির মতো এই ‘বই পার্বণে’ ব্যবসার যোগ আছে। ব্যবসার যোগ থাকা দোষের কিছু নয়, লক্ষ্মীর সঙ্গে সরস্বতী একত্রে বাস করতেই পারে। সেখানে বিবাদের কিছু নেই। যারা বইকে ঘিরে উৎসব তৈরির চেষ্টা করছেন তারাও জানেন এখানে লক্ষ্মী ও সরস্বতী একত্রে বাস করছে। অর্থাৎ এখানে বাণিজ্য ও জ্ঞানের সিমোবায়োসিস।  বর্তমান পৃথিবী বাণিজ্যের সব বাধা তুলে দিচ্ছে দিনে দিনে। এখন আর বাধা নেই বললেই চলে। এছাড়া কেউ বাধা দিলে সেটাকে মানুষ ভালো চোখে দেখে না। যেমন যখন কোনও না কোনোভাবে আমাদের কোনও পণ্য ভারতে ঢুকতে ভারত বাধা দেয় সেটা ভালো চোখে নেয় না কেউই। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যখন এই সত্যকে মেনে নেওয়া হচ্ছে তখন ভেবে দেখা দরকার জ্ঞানের ক্ষেত্রে কী করা প্রয়োজন! জ্ঞানের রাজ্যে সেই সুদূর অতীত থেকেই কেউ বাধা দেয়নি। বরং নানানভাবে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত অবধি। যার ফলে পৃথিবী কম বেশি সমান্তরালে এগিয়েছে। আর যারা যেখানে জ্ঞানকে প্রবেশে বাধা দিয়েছে তারা পিছিয়ে  পড়েছে। উৎসব মানুষকে আনন্দ দেয় আর মানুষের প্রাণ বাঁচিয়ে রাখে জ্ঞান বা বোধ। বোধের ক্ষেত্রে তাই কোনও প্রাচীর তুলতে নেই। মানুষ তার ভাষাতে সব জ্ঞান চায় এ জন্যে, ভাষাগত কোনও প্রাচীর যেন বোধের ক্ষেত্রে না ওঠে। তবে শুধু নিজের ভাষাতেই সব জ্ঞানকে আহরণ করা যায় না। তাই যুগে যুগে মানুষ শিখেছে একে অন্যের ভাষা। আর এই ভাষাই মানুষকে মানুষ হতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে লক্ষ কোটি বছর ধরে, এই ভাষায় মানুষকে সাহায্য করেছে একক সামাজিক জীব হতে। ভাষাই তার অক্ষরে ধরে রেখেছে জ্ঞানকে।
অনেকে এখনও মনে করেন, ভাষা আন্দোলন মানেই ছিল আমরা শুধু বাংলা শিখব, বাস্তবে তা কখনও নয়। ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে। তবে জ্ঞানের জন্য  সব ভাষার প্রবেশে ও শিক্ষায় কোনও বাধা নেই। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের একুশের বই মেলা ঘিরে যে বাণিজ্য, সেখানে সমস্যা হচ্ছে এই বাণিজ্য জ্ঞানের প্রবেশকে বাধা দিচ্ছে। সারা পৃথিবীর বই এখানে আসছে না। শুধুই দেশীয় লেখকের বই, শুধুই নিজস্ব চিন্তা। এখানে পৃথিবীর মিলন ঘটছে না। তাই এটাও আমাদের তের পার্বণের সঙ্গে আরেক পার্বণ হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীর যোগ হলে তখন নিঃসন্দেহে এই মেলা হয়ে আর তের পার্বণের আরেক পার্বণ থাকবে না। বরং বোধের সঙ্গে উৎসবের এক মিলন মেলা হবে তখন।
লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক







© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};