ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
77
লুইস গ্ল্যুক সংকট উত্তরণের কবি
Published : Sunday, 18 October, 2020 at 12:00 AM
কায়সার হেলাল ||

সাহিত্যে এ বছর (২০২০)  নোবেল পেলেন লুইস এলিজাবেথ গ্ল্যুক। তিনি এ পর্যন্ত সাহত্যে নোবেল পাওয়া নারীদের মধ্যে ১৬তম । ঠিক কোন কোন বৈশিষ্ট্যের জন্য তিনি নোবেল পেলেন? এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা সমালোচনা হাজির করা যেতে পারে। নোবেল কমিটি তাঁকে সম্মানিত করেছেন তাঁর নিখুঁত ও অবিশ্বাস্য কাব্যিক কণ্ঠস্বরের জন্য যা একই সঙ্গে কঠোর ও কর্কশ সৌন্দর্যের সাথে মিলে স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে বিশ্বজনীন করে তোলে। সত্যিকার অর্থে গ্ল্যুক পরিচিত হয়েছেন তাঁর কাব্যের গীতল সুর, ভাষাগত নির্ভুলতা ও বয়ানের প্রায়োগিক কাঠিন্যতা দিয়ে। তিনি আত্মনিমগ্ন এক স্বতন্ত্র ব্যক্তি যিনি বেদনার গভীরে ঝাঁপ দিয়ে তুলে আনেন দূর্লভ বিশ্বজনীন সংবেদ। কবি ক্রেগ মরগান টেইচার তাঁকে বর্ণনা করেছেন এইভাবে যে তিনি হলেন তাঁদের লেখক যাদের নিকট শব্দেরা দুষ্প্রাপ্য, কষ্টার্জিত এবং অবিনশ্বর হিসেবে ধরা দেয়। প-িত লরা কুইনি অবশ্য তাঁকে সেইসব আমরিকান কবিদের কাতারে ফেলতে চান যারা কাব্যের শব্দের সাবধানি ব্যবহারের পাশাপাশি তীব্র লিরিক সংক্ষেপণকে গুরুত্ব দেন। লরা কুইনি আরও উল্লেখ করেছেন গ্ল্যুক আদতে কবি এমিলি ডিকিনসন থেকে এলিজাবেথ বিশপ পর্যন্ত একই কাতারভুক্ত। গ্ল্যুকের কবিতা অতোটা ছান্দিক নয়, পুনরাবৃত্তি নির্ভরতা প্রকট, কিন্তু তাঁর কবিতা প্রবহমানতা ও গতি ধরে রাখে বলে ছন্দ পতন ঘটে না।
বিদগ্ধ প-িত ও সমালোচকরা তাঁকে বারবারই স্বীকারোক্তিমুলক কবি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এই কারণে যে গ্ল্যুক তাঁর কবিতায় বড্ড বেশি আত্মপ্রবণ, অন্তরঙ্গ ও ব্যক্তি কেন্দ্রিক। উত্তম পুরুষের ব্যবহার তাঁর কবিতায় বেশ জোরালো। উচ্চকিত কণ্ঠে তিনি যেন নিজের যাপিত জীবনের বাঁক, খাদ আর ¯্রােতের বিপরীতে চলার সন্দর্ভ গীতল সুরে মেলে ধরেন পাঠকের সামনে। পাঠকও যেন নিজেকে কবির জায়গায় প্রতিস্থাপিত করে ফেলেন অনায়াসে। এবং গ্ল্যুকের কবিতায় পাঠক ও কবির এই জটিল মেলবন্ধন ক্রমশ একপ্রকার আচ্ছন্নতার দিকে হেলে পড়ে। একই সাথে করুণ কিন্তু নির্মম এক রসের ভা-ে পাঠককুলকে যেন খাবি খাইয়ে ছাড়েন কবি লুইস গ্ল্যুক।
অবশ্য সমালোচক মাইকেল রবিন্স গ্ল্যুকের কবিতার এমন আচরণের বেলায় একমত নন। স্বীকারোক্তিমূলক অন্য দুই বিখ্যাত কবি সিলভিয়া প্লাথ অথবা জন বেরিম্যানের চাইতে গ্ল্যুকের কাব্য-ঢং আলাদা, বরং গ্ল্যুকের কবিতা অনেকটাই ব্যক্তিগতÑগোপন কিন্তু অলীক কাহিনি নির্ভর। অন্য অর্থে স্বীকারোক্তি করার জন্য যেহেতু গ্ল্যুক তাঁর কবিতায় কোন নির্দিষ্ট শ্রোতা উপস্থিত রাখেন না সেহেতু তাঁকে স্বীকারোক্তিমূলক কবি বলা যায় না। আরেকটু এগিয়ে গ্ল্যুকের প্রতি কুইনির যুক্তি হলো, স্বীকারোক্তিমূলক যুক্তির ধারণাটিই উদ্ভট। অন্যদিকে অন্যেরা উল্লেখ করেছেন গ্ল্যুকের কবিতাগুলোকে আত্মজৈবনিক হিসেবে দেখা যায়, যদিও তার কবিতা পুরাণ ও ব্যক্তি জীবনের বিভিন্ন মাত্রার মিশেল, তবুও কবিতাগুলো যেন নিছক স্বীকারোক্তিরও অধিক। প-িত হেলেন ভেন্ডলার যেমন বলেছেন, গ্ল্যুকের কবিতার আধ্যাত্মিকতা ও সংরক্ষণবাদিতার এমন এক উত্তম পুরুষ কেন্দ্রিক বিকল্প স্বীকারোক্তিমুলক আয়োজন করে যা শেষমেশ নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগত।
গ্ল্যুকের কবিতার সারবস্তুও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। প-িত ও সমালোচকেরা তাঁর কবিতাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রমা বা বেদনা নির্ভর বয়ান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেননা তাঁর পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে তিনি মৃত্যু, ক্ষয়-ক্ষতি, প্রত্যাখান, সম্পর্কজনিত ব্যর্থতা এবং নিরাময় ও নতুন করে শুরু করবার প্রেরণাকে তাঁর কবিতায় এনেছেন অসামান্য দক্ষতায়। মৃত্যুজনিত সতর্কতা, হারিয়ে ফেলার ভয় তাঁকে যেন দিয়েছে অদ্ভুত এক কাব্যশক্তি যা তার কবিতায় প্রলয়ের অনুভূতি সঞ্চারিত করে।‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস’ কাব্য গ্রন্থে উল্লেখিত সেই ট্রমা যেন জীবনের মহান সত্যের দিকে যাবার একমাত্র দরজা। আরেকটি জিনিস ঘুরেফিরে আমরা পাই, সেটা হলো ‘আকাক্সক্ষা।’খোলাখুলি বললে গ্ল্যুকের কবিতায় আকাক্সক্ষা বা বাসনার প্রয়োগ, কী প্রেমে কী অন্তরদৃষ্টিতে, এসেছে যুগপৎ সত্যনিষ্ঠতা ও অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে। গ্ল্যুক তাঁর কবিতায় কখনো কখনো পরস্পর বিরোধিও; বিশেষ করে ক্ষমতা, মর্যাদা, মূল্যবোধ, লৈঙ্গিক অবস্থা বা ভাষার ক্ষেত্রে। তার কবিতা থেকে কবিতায় তিনি যেন পুরোনো আকাক্সক্ষার সঙ্গে বিরোধ তৈরি করেন এবং ব্যক্তিক অভিজ্ঞানকে অনায়াসে সে বিরোধের ভেতর প্রতিস্থাপন করেন।
তারপর গ্ল্যুকের কবিতায় প্রকৃতি-প্রেম বা প্রাকৃতিক পরিণতির বহুমুখি পর্যায় এসেছে সাবলিলভাবে। যেমন তাঁর ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ কাব্যে ফুল কথা বলে বাগানের মালির সাথে, প্রকৃতির সাথে। প্রকৃতির ভেতর লুকায়িত শাশ্বত এক শক্তির সাথেও সে ফুল এমন এক কথোপকথনের অবতারণা করে যে অবস্থাদৃষ্টে এই যাদুবাস্তবতাকে চরম বাস্তব বলে ভ্রম হয়। প্রকৃতি এসেছে তাঁর ‘দ্য হাউস অন মার্শল্যান্ড’ কাব্যগ্রন্থেও, অনেকটা প্রকৃতি-সংলগ্ন কবিতায় রোমান্টিক ঐতিহ্য নিয়ে। ‘আরারাত’ কাব্যগ্রন্থে ফুল হয়ে ওঠে শোক ও বিলাপের ভাষা। প্রতীকিকরণের অর্থবহ মাত্রায় প্রকৃতির মালিকানা যেন শোক প্রকাশকারীদের মাঝে ঐতিহাসিক স্মরণ ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ধরা দেয়। গ্ল্যুকের প্রকৃতি প্রেম যেন এক স্বর্গীয় অবস্থার কথা বলে।‘সেলেস্টিয়াল মিউজিক’ কবিতায় বয়ানকারী বলছেন-‘যখন পৃথিবীর প্রেমে পড়বে তখন তুমি শুনতে পাবে স্বর্গীয় সঙ্গীত।’ আবার ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ কবিতায়ও দেখা যায় প্রকৃতি-দেবতা কথা বলছেন ঋতু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে তিনি সচেতনভাবে তাঁর কবিতায় জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস কিংবা লৈঙ্গিক আধিপত্য এড়িয়ে গেছেন। তিনি কখনো ইহুদী-আমেরিকান কবি, নারীবাদী কবি বা প্রকৃতির কবি বলে ব্র্যাকেটবন্দি হতে চাননি।

‘তিনি (লুইস গ্ল্যুক) ক্রমশ কবি হয়ে উঠছেন’- এ ভাবনা তাঁর মনে ঠিক কবে থেকে  পোক্ত হলো তা তিনি নিজ জবানিতে পরিস্কার করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে। গ্রিক মিথোলজি দিয়ে তাঁর শুরু। রাশিয়ান-ইহুদী বংশোদ্ভুত গৃহিণী মা এবং হাঙ্গেরিয়ান-ইহুদী বংশোদ্ভুত পিতার আমরিকান (স্থানান্তরিত) সন্তান লুইস গ্ল্যুক বাবা মার কাছেই বিভিন্ন কাসিক গল্প-উপন্যাস  ও  পুরাণের ধারণা পেয়েছিলেন শৈশবে। তাঁর পিতার মধ্যে ছিল লেখক হবার প্রবল বাসনা। হয়তো এই আকাক্সক্ষাই গ্ল্যুককে কবি হবার পথে প্রথম অনুপ্রাণিত করে থাকবে। কেননা ছোট বেলাতেই তাঁর লেখাজোকার শুরু। তাঁর কল্পনাশক্তি ছিল খুব প্রকট। এক জায়গায় তিনি বলেছেন- ‘বাস্তববাদ কি জিনিস তা কখনোই আমার ধারণার মধ্যে ছিল না এবং কল্পনা-প্রবণতার সঙ্গে আমি বাস্তববাদিতার খুব একটা পার্থক্যও করতে পারি না।’ গ্রিক পুরাণ, অয বুক্স (এল. ফ্রাঙ্ক বম’এর ফিকশন সিরিজ, যা মূলত বাচ্চাদেরকে যাদুর দেশ ল্যান্ড অব অযের ফ্যান্টাসিপুর্ণ জগতে নিয়ে যায়) এবং পরবর্তীতে শ্রেষ্ঠ মানবদের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের প্রভাব তাঁর বিভিন্ন লেখায় তিনি স্বীকার করেছেন।‘রিয়েলিজম এন্ড ফ্যান্টাসি’ নামের এক প্রবন্ধে তিনি ‘হাইপোথিসিস এবং স্বপ্নরুপে কল্পনার জগৎ বিরাজমান’ বলে দাবি করেছেন। কল্পনার জগৎ শেষ হয় এমনভাবে যেন কখনো এটি শুরুই হয়নি অথবা এটি হয়তো কোন হাইপোথিসিসের ভেতর কোন এক সময় ঘটে থাকবে। তাহলে লুইস গ্ল্যুক কবিতা বলতে কী বুঝেন? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দ্বারা মীমাংসা করতে চান।‘শিশুরা কীভাবে কোন পুস্তক আত্মস্থ করে?’Ñ এ প্রশ্নের গহীন কূপে তিনি তাঁর পাঠককে ছুঁড়ে ফেলেন যেন। শিশুদের মগজে অস্থায়ীরুপে জেঁকে বসে থাকা ভরপুর বাঁচার আমন্ত্রণ এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেসব অস্থায়ী ফ্যান্টাসিই কী তবে বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করে তোলে? গ্ল্যুকের ক্ষেত্রে হয়তো এমনটিই ঘটে থাকবে। তাঁর বেলায় কবিতা হলো কোন পুস্তক পাঠের সময়ে অথবা নিজেকে অস্তিত্বশীল ভাবার সময়ে পাঠক যেভাবে চিন্তা করেন, কবিতা আসলে তেমনি, যেন সীমাবদ্ধতার চিহ্নযুক্ত নিজ সত্তা থেকেও স্বাধীন।
কৈশোরে উত্তীর্ণ হয়েই গ্ল্যুক শিকার হলেন এনোরেক্সিয়া নার্ভোসা নামক এক রোগের যার পরিণতি বন্ধ্যাত্ব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণভাবে এ রোগের ক্ষেত্রে রোগী ভাবেন তিনি অত্যধিক স্থূলকায়। যদিও তাঁর ওজন স্বাভাবিকের চাইতেও অনেক কম। সেক্ষেত্রে রোগী প্রথমে খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয়, ধীরে ধীরে ওজন আরও কমতে থাকে এবং নিজেকে শীর্ণকায়া দেখানোর তীব্র আকাক্সক্ষা ভয়ংকর পরিণাম ডেকে আনে। মনোবিকলনের চূড়ান্ত ধাপে নিয়ে যাবার মতো ক্ষমতা থাকা এই রোগটি গ্ল্যুকের ক্ষেত্রে আরও প্রবল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায় তাঁর পরিবারে এই একই রোগে তাঁর জন্মের আগেই জেষ্ঠ্য বোনের মৃত্যুর ইতিহাস আছে। এক কৈফিয়তে তিনি রোগটিকে বর্ণনা করেছেন, তাঁর মায়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার জেদ হিসেবে। হাইস্কুলের পাঠ শুরু হবার প্রাক্কালে তাঁর উল্লেখিত রোগের চিকিৎসার অংশ হিসেবে মনোসমীক্ষণমূলক চিকিৎসা আরম্ভ হয়। এক পর্যায়ে স্কুল থেকে ছাঁটাইও হন। তাঁর মানসিক পুনর্বাসনের দিকে জোর দেবার প্রয়োজনেই মূলত এই সিদ্ধান্ত। বিষয়টি নিয়ে তিনি লিখেছেন- ‘আমি বুঝতে পারছিলাম যে জীবনের এই পর্যায়ে মৃত্যুই একমাত্র ভবিতব্য। তবে তার চাইতেও স্পষ্ট ও চাক্ষুষভাবে টের পাচ্ছিলাম আমি মরতে চাই না।’ পরবর্তী ৭ বছর গ্ল্যুকের থেরাপি নিয়েই কাটল। তিনি অবশ্য এই রোগ ও থেরাপির পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তাকে সুস্থ হতে সাহায্য করবার জন্য এবং চিন্তা-পদ্ধতির শিক্ষা দেবার জন্য। যদিও পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণকেও বিসর্জন দিতে হয়েছিল এই অর্থে যে শিক্ষার চাইতে সুস্থ হওয়া বেশি জরুরি। তিনি এক জায়গায় বলেছেন তাঁর ওই সময়কার আবেগময় অবস্থা, চরম চারিত্রিক অনমনীয়তা এবং বিভিন্ন আচারের ওপর মারাত্মক নির্ভরতা উচ্চ শিক্ষার পথে অন্তরায় হয়ে ওঠেছিল। তবে এই সময়টাতে তিনি সারাহ লরেন্স কলেজ থেকে পেয়েছেন কবিতার বিস্তৃত জ্ঞান। এরপর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন, পাঠ নিয়েছেন ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত। এখানে তিনি আমেরিকার প্রখ্যাত কবিদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন যাঁদের মধ্যে লিওনি এডাম্স ও স্টেনলি কুনিত্জ উল্লেখযোগ্য। গ্ল্যুক তাঁর কবি সত্তা অর্জনের অভিযাত্রায় এই শিক্ষকদ্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা বলে উল্লেখ করেছেন।
গ্ল্যুক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেছিলেন কোনো ডিগ্রি ছাড়াই। নিজের ভরণপোষণ চালানোর জন্য সম্পৃৃক্ত হয়েছিলেন সাচিবিক কাজে। ১৯৬৭তে বিয়ে করেছিলেন, ১৯৬৮ তে ডিভোর্স। এতসব চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফাস্টবর্ন’ প্রকাশ পায়। কাব্যগ্রন্থটি সমালোচকদের মোটামুটি দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়। অথচ এরপরই গ্ল্যুকের জন্য অপেক্ষা করছে সুদীর্ঘ রাইটার্স ব্লক। ১৯৭১’র পর তিনি এই দশা থেকে মুক্তি পান। তাঁর ভাষায় ভারমন্টের গোডার্ড কলেজে কাব্যতত্ত্ব পড়ানোতে যুক্ত হবার পর তিনি রাইটার্স ব্লকের কবল থেকে ছাড়া পান। ভারমন্টে শিক্ষকতার সময়ের কবিতা সংকলিত হয়ে দ্বিতীয় বই ‘দ্য হাউস অন মার্শল্যান্ড (১৯৭৫)’-এ।  বলা হয় এটিই তাঁর যুগান্তকারি কাজ। যা ব্যাপকভাবে সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। এবং কবিতার জগতে তিনি একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৭৩’র দিকে তাঁর পুত্র সন্তান আসলো, তাঁর তৎকালীন সঙ্গী জন ড্রানোর ঔরসে। ১৯৭৭-এ অবশ্য তারা বিয়েটা সেরে ফেললেন। এই জন ড্রানো এবং আরেক কবি অ্যালেন ব্রায়ান্ট ভোইটের স্বামী ফ্রান্সিস ভোইট মিলে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘দ্য নিউ ইংল্যান্ড কুলিনারি ইন্সটিটিউট’, একটি রন্ধনশিক্ষা সম্পর্র্কীয় প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানে গ্ল্যুক ও ড্রানো প্রথম বিনিয়োগকারী এবং পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। গ্ল্যুকের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটি বের হয় ১৯৮০তে, ‘ডিসেন্ডিং ফিগার’ নামে। এটিও মোটামুটি পাঠক/সমালোচক কর্তৃক ভালোভাবেই গৃহীত হয়। তবে সমালোচনার শিকার যে হয়নি তা-ও নয়। বিশেষ করে প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক গ্রেগ কুজমা গ্ল্যুকের ‘দ্য ড্রাউন্ড চিলড্রেন’ কবিতাটির জন্য গ্ল্যুককে শিশু বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেছেন। সবচেয়ে বাজে ঘটনাটি ঘটল এই বছরই। গ্ল্যুকের ভারমন্টের বাড়ি সব সম্পত্তিসহ আগুনে পুড়ে গেল। এই দুঃখজনক ঘটনা গ্ল্যুকের জন্য শাপে বর হলো কিনা হলফ করে বলা যাবে না। ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিক্স সার্কেল এওয়ার্ড ফর পোয়েট্রি’ পুরস্কার জিতে নেয় তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস (১৯৮৫)।’ কাব্যগ্রন্থটিকে লেখক ও সমালোচক লিজ রোজেনবার্গ নিউইয়র্ক টাইমসে অধিক স্পষ্ট, নিখুঁত এবং ধারালো বলে অভিহিত করেছিলেন, গ্ল্যুকের আগেকার অন্যান্য কাজের চাইতেও। সমালোচক পিটার স্টিট দ্য জর্জিয়া রিভিউতে গ্ল্যুককে বইটির জন্য এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের কাতারে সামিল করেছিলেন। এই বইটির একটি কবিতা ‘মক অরেঞ্জ’ নারীবাদীদের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছিল এবং খুব দ্রুত কবিতাটি বিভিন্ন সংকলনে ছাপা হওয়ার পাশাপাশি কলেজ কোর্সেও পাঠ্য হলো। ১৯৮৪ তে গ্ল্যুক ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়াম কলেজে ইংরেজির সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দিলেন। এ বছরই তাঁর বাবা মারা গেলেন। পিতার মৃত্যুই যেন তাঁকে পঞ্চম কাব্যগ্রন্থের দিকে ধাবিত করল। নুহের নৌকা প্লাবনের সময়ে যে পর্বতে বিশ্রাম নিয়েছিল বলে পুরাণে কথিত আছে সেই পর্বতের নামেই কাব্যগ্রন্থটির নাম হলো ‘আরারাত (১৯৯০)।’ ২০১২তে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে সমালোচক ডুয়িট গারনার কাব্যগ্রন্থটি সম্পর্কে লিখেছিলেনÑআমেরিকান কবিতার ইতিহাসে বিগত ২৫ বছরের মধ্যে এই বইটি সর্বাধিক নৃশংসতা ও দুঃখে পরিপূর্ণ। ধারাবাহিকভাবে ১৯৯২তে তাঁর আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় তিনি ফুলের সাথে মালি এবং জীবন ও প্রকৃতি-দেবতার কথপোকথন চিত্রিত করেছেন। পাবলিশার্স উইকলি বইটিকে মহান সৌন্দর্যের কাব্যে ভরপুর গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ বলে ঘোষণা দিয়েছিল। ক্রিশ্চিয়ান সাইন্স মনিটরে সমালোচক এলিজাবেথ লুন্ড উল্লেখিত কাব্যগ্রন্থটিকে গ্ল্যুকের মাইলফলক কাজ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন এবং এই বইটি গ্ল্যুককে শ্রেষ্ঠ আমেরিকান কবি হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। আর ১৯৯৩তে ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ জিতে নেয় সাহিত্যের আরেক মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পুলিৎজার প্রাইজ। যদিও ৯০ থেকে গ্ল্যুকের সাহিত্যখ্যাতির আরম্ভ, ঠিক এই সময়টাতেই তাঁকে যেতে হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে। এই সময়েই জন ড্রানোর সাথে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে। ফলে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব থেকে ড্রানো পদত্যাগও করেন। এতসব উত্থান-পতনের মধ্যে গ্ল্যুক ভেঙে পড়েননি। তাঁর অভিজ্ঞতাকে লেখাতে রূপান্তরিত করেছেন এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশ করেছেন। প্রবন্ধগ্রন্থ এলো ১৯৯৪তে, ‘প্রুফ এন্ড থিউরিজঃ এসেইজ অন পোয়েট্রি’ নামে। তারপর একে একে এলো মিডোল্যান্ডস (১৯৯৬), ভিটা নোভা (১৯৯৯) এবং দ্য সেভেন এজেস (২০০১) নামের কাব্য সংকলন। প্রেমের প্রকৃতি ও বিবাহের অবনমন সংক্রান্ত বিষয়আশয় নিয়ে ছিল মিডোল্যান্ডস কাব্যগ্রন্থটি। ২০০১-এ নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে ২০০৪-এ গ্ল্যুক একটি দীর্ঘ কবিতার বই ‘অক্টোবর’ প্রকাশ করেন। ৬ ভাগে বিভক্ত এই কাব্যগ্রন্থে প্রাচীন গ্রিক মিথকে উপজীব্য করে দুঃখভোগের বিভিন্ন দিক অনে¦ষণ করেছেন গ্ল্যুক। এ বছরেই তিনি ‘রোজেনক্রাঞ্জ রাইটার ইন রেসিডেন্স এট ইয়েল ইউনিভার্সিটি’ খেতাবে ভূষিত হন।
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো-এভারনো (২০০৬), আ ভিলেজ লাইফ (২০০৯) এবং ফেইথফুল এন্ড ভারচুয়াস নাইট (২০১৪)। ‘পোয়েম্স ঃ ১৯৬২-২০১২’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। ২০১৭ তে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি প্রবন্ধ সংকলন ‘আমেরিকান অরিজিনালিটি’।

গ্ল্যুকের কবিতায় তবে কিসের প্রভাব? কবিতা ও কবিকে পাশাপাশি দাঁড় করালে আমরা দেখব তাঁর যাপনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আকৃতির বাঁধা ও বিঘেœর জয়জয়কার। এতোটা সয়েছেন, মানসিক ও শারীরিকভাবে, ফলে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে কখনো কখনো ফ্রয়েডীয় মনোঃসমীক্ষণ দ্বারা প্রভাবিত। পাশাপাশি পুরাণ ও প্রাচীন কাহিনি-কেত্তনের উপর শৈশব থেকেই ব্যাপক দখল তাঁকে ও তাঁর কবিতাকে কখনোই মুক্তি দেয়নি। যদিও সমালোচকরা তাঁর সাহিত্যকর্মে রবার্ট লোয়েল, রাইনার মারিয়া রিলকে কিংবা এমিলি ডিকিনসনের প্রভাব খুঁজে পান বলে দাবি করেন। যাই হোক, আখেরে এ কথা বলা অসমীচিন হবে না যে সংকট ও বাঁধা ব্যতিত শিল্পের স্বরূপ বোঝা যায় না। ঘাত-প্রতিঘাতের সমীকরণই মূলত শিল্পীর আরাধ্য। হয়তো এই সমীকরণ কখনো মেলে, কখনো মেলে না।
লেখক: কবি ও চিকিৎসক








© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};