ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
605
শহরজুড়ে অন্তহীন ভোগান্তি
জহির শান্ত ||
Published : Monday, 19 October, 2020 at 12:00 AM, Update: 19.10.2020 1:04:57 AM
শহরজুড়ে অন্তহীন ভোগান্তি*সড়কে যানজট, ফুটপাতে হকার, পথেঘাটে ‘উন্নয়নের’ খোঁড়াখুঁড়ি
*বাইরের কাজ সেরে কান্ত-ঘর্মাক্ত হয়ে ঘরে ফেরেন কুমিল্লাবাসী

‘আবাসিক শহর’ হিসেবে একসময় ‘আদর্শ’ হয়ে ওঠা কুমিল্লা এখন পরিণত হয়েছে দুর্ভোগ আর ভোগান্তির শহরে। প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়সহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে দীর্ঘ যানজট আর দখল হয়ে যাওয়া ফুটপাতে হেঁটে চলা দায় হয়ে পড়েছে কুমিল্লাবাসীর। সেই সাথে রোদ-বৃষ্টির দিনে ধুলা-কাদা-জলের বিড়ম্বনার পাশাপাশি বছড়জুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির দুর্ভোগ তো আছেই। ফলে নিত্যপ্রয়োজনে বের হওয়া শহরের বাসিন্দারা পথে পথে বিশৃঙ্খলার পাহাড় ডিঙিয়ে কাজ শেষে ঘরে ফেরেন ঘেমে-নেয়ে, কিষ্ট-পিষ্ট চেহারা নিয়ে।
গেলো এক সপ্তাহ ধরে কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে নাগরিক যন্ত্রণার এমন চিত্রই দেখা গেছে। নগরবাসী বলছেন, পরিকল্পনাহীন এ নগরে কেবল বড় বড় ইমারত উঠছে, উন্নয়নের নামে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। বিপরীতে নাগরিক সুবিধার ছিটেফোঁটাও মিলছে না। এ কষ্ট থেকে মুক্তি চান তারা; চান পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপÑ যেন ‘শহর’ ছাড়িয়ে ‘নগরে’ রূপ নেয়া কুমিল্লায় ন্যূনতম নাগরিক সুবিধা ও স্বস্তিটুকু মেলে।
কুমিল্লা শহর ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের প্রায় ৭ দিনই অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সব সড়কেই দীর্ঘ যানজট। সেই সাথে ভ্রাম্যমাণ হকার আর অবৈধ স্ট্যান্ডে সিএনজিচালিত অটোরিকশার জটলা। দরকারি কাজে শহরের বাইরে যাওয়া কিংবা উপজেলা থেকে শহরে আসা মানুষজনকে শাসনগাছা রেলওয়ে ওভারপাস পার হয়ে কান্দিরপাড় আসতে রেইসকোর্স, পুলিশ লাইন, ঝাউতলা ও বাদুড়তলায় যানজটে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে হয়। কান্দিরপাড় এসেও মুক্তি নেই। চতুর্মুখী গাড়ির জট লেগে থাকে পুরো কান্দিরপাড়-পূবালি চত্ত্বর জুড়ে।  সেখান থেকে রাজগঞ্জ-চকবাজার, মোগলটুলি, টমসনব্রিজ কিংবা রাণীর বাজারমুখী সব পথেই থেমে থাকা রিকশা আর অটোরিকশার দীর্ঘ সারি। হেঁটে চলারও জো নেই। কারণ, দখল হয়ে আছে ফুটপাত। হকার-দোকানিদের কবলে রূদ্ধ হয়ে থাকা ফুটপাতে পা ফেলে ফেলে চলা দায় পথচারীর। ফলে রোদে-গরমে পুড়ে কান্ত-শ্রান্ত পথচারীরা রাজ্যের বিড়ম্বনা সয়েই সেরে নেন প্রয়োজনীয় কাজ; নয়তো যানজটের ভোগান্তি আর কয়েকগুণ সময় ব্যয় করে থাকতে হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায়।
ছুটির দিন গতকাল শুক্রবার বিকেলেও কুমিল্লার লিবার্টি চত্ত্বরে গিয়ে দেখা যায় যানজটের চিত্র। চত্ত্বর ঘিরে চারদিকের সড়কে থেমে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। সেখানে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশের সদস্য একদিকের সড়ক বন্ধ রাখার ইশারা করে দাঁড়িয়ে আছেন; বাকি তিনদিক দিয়ে এলোমেলোভাবে গাড়িগুলো যাচ্ছে কান্দিরপাড় কিংবা বিপরীতের রাজগঞ্জ-চকবাজার ও ভিক্টোরিয়া কলেজ হয়ে মহিলা কলেজের দিকে। কিন্তু যানজটের চিত্র বদলাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর বন্ধ দিকটা খুলে দিয়ে আরেকটা দিক বন্ধ করে দিচ্ছেন। একইভাবে এলোমেলো চলছে রিকশা-অটোরিকশা। যানবাহনের চাপ সামলাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে।
এর আগে দুপুরে রাজগঞ্জ বাজার এলাকায় গিয়েও দেখা গেছে দীর্ঘ যানজট। বাজারের বিপরীত পাশে থানা-সড়ক বন্ধ করে নির্মাণ করা হচ্ছে ড্রেন। শ্রমিকরা কাজ করছেন; নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা হয়েছে রাস্তায়। একে তো থানার দিকে যাওয়ার সড়ক বন্ধ, অন্যদিকে প্রধান সড়কেও প্রতিবন্ধকতাÑ ফলে গাড়ি ও পথচারীদের চাপ বেড়েছে; বেড়েছে ভোগান্তিও। কে আগে যাবেÑ গাড়ি না পথচারী?
সেখানে কথা হয় বাজারের ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আবদুল হকের সাথে। তিনি বলেন, ‘রাজগঞ্জ বাজারের চারদিক ঘিরেই মহাভোগান্তি। বাজারের ভেতরে ময়লা পানি-আবর্জনা, আর বাইরে যানজট-মানুষের ভিড়। হাঁটার জায়গা নেই। রিকশাও ডেকে আনা দায়। বাজারের ব্যাগ হাতে অনেকখানি পথ হেঁটে তারপর যানবাহনে উঠতে হয়।’
রাজগঞ্জ থেকে কান্দিরপাড় পর্যন্ত পুরো সড়কটিতে সারাদিনই যানজট লেগে থাকে। এ সড়কের দুই পাশে রয়েছে অভিজাত বিপণী বিতানÑ সাত্তার খান কমপ্লেক্স, খন্দকার হক টাওয়ার, ময়নামতি গোল্ডেন টাওয়ার, আনন্দ সিটি সেন্টারসহ বেশ কয়েকটি শপিং কমপ্লেক্স। এছাড়াও সোনালী ব্যাংকের কুমিল্লা কেন্দ্রীয় শাখাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক-বীমা কার্যালায়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী রসমালাই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘মাতৃভা-ারের’ কারণে সারাক্ষণই যানবাহন ও মানুষের চাপ থাকে এ এলাকায়। পাশাপাশি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের সামনের ফুটপাতই দখল হয়ে আছে। আছে হকার-যন্ত্রণাও। ফলে  স্বাভাবিক সময়ে ১০ মিনিটে পারাপারের এ সড়কে যানজট কেড়ে নেয় ৫০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা।
এছাড়াও নিত্য যানজটের দেখা মেলে শহরের চকবাজার, মোগলটুলি, লাকসাম রোড, টমসনবিজ্র, নজরুল এভিনিউ, রাণীর বাজার, রেলস্টেশন সড়ক, শাসনগাছা থেকে ধর্মপুর সড়কসহ অন্যান্য আরো গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। এসব এলাকায় যানজটের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে অনুমোদনহীন সিএনজি অটোরিকশাস্ট্যান্ড। সেই সাথে সড়কে সড়কে উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়ি তো আছেই।
কুমিল্লার প্রবীণ নাগরিক ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক বলেন, ‘কুমিল্লাবাসী নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত। সড়কে যানজট। ফুটপাতও দখলে। ঘর থেকে বের হলেই ভোগান্তি। মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ সবাই। রাতে সড়কবাতি জ¦লে না।’ তিনি বলেন, ‘কর অফিস থেকে ঠাকুরপাড়া মদিনা মসজিদ সড়কটি ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা। হালকা বৃষ্টিতেই সড়কটি ডুবে যায়। অকার্যকর ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশন হয় না। বছরজুড়েই নানা ভোগান্তি লেগে থাকে।’
কুমিল্লা শহরজুড়ে নানা দুর্ভোগ-ভোগান্তির মধ্যেই সড়কগুলোতে রয়েছে আবার হকারদের দৌরাত্ম্য। শুধু শহরের রাজগঞ্জ থেকে কান্দিরপাড় লিবার্টি মোড় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার রাস্তায় অন্তত এক শ’ হকার ভ্যান ও ঝুঁিড়তে করে ফল, সবজি, জুতা, জামা-কাপড়,  তৈজসপত্র বিক্রি করেন। যানজট-ফুটপাত দখলের তোয়াক্কা না করেই চলে তাদের এ দৌরাত্ম্য। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি হকার বসে সন্ধ্যার পর কান্দিরপাড় লিবার্টি মোড় থেকে মনোহরপুর মাতৃভা-ার পর্যন্ত। এদিকে পূবালী চত্বর থেকে নজরুল এভিনিউ পর্যন্ত রাস্তার উত্তর পাশে কাত্যায়নী কালীবাড়ির সামনে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন হকাররা। রাস্তার দক্ষিণ পাশ দখলে থাকে অটোরিকশাচালকদের আর উত্তর পাশ দখল নিয়ে আছেন হকাররা। একই দশা শাসনগাছা এলাকার। ফাইওভারের নিচের আইল্যান্ডে হকাররা নিয়মিত পসরা সাজিয়ে বসছেন। এসব ‘স্থায়ী’ হকার ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ হকাররা ভ্যানে করে সবজি, ফল বা অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে রাস্তার ওপরই বসে পড়েন।
কুমিল্লা জেলা ট্রাফিক পুলিশ ইনচার্জ মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে প্রথমেই ফুটপাত দখলমুক্ত করতে হবে। শহরের অধিকাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে। এসব হকারদের পাশাপাশি যারা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানের সামনের ফুটপাত দখল করে রেখেছেন, সেগুলোকেও দখলমুক্ত করতে হবে। তাহলে সড়কের শৃঙ্খলা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনা যাবে।’
যানজট নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ট্রাফিক পুলিশ স্বল্পতার’ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ জনবল দিয়ে চলছে কুমিল্লা জেলার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। এই শাখায় বর্তমানে কর্মরত আছেন ৪৯ জন কনস্টেবল, ৭ জন সার্জেন্ট ও ১ জন পিএসআই। এর মধ্যে ২ জন ট্রাফিক শাখার মুন্সী। দাউদকান্দি, লাকসাম ও দেবিদ্বার উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন ৯ জন। এর মধ্যে যদি দুই শিফটে ৪ জন করে ৮ জন ছুটি কিংবা অসুস্থ থাকেন, তাহলে নগরীতে ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল থাকে মাত্র ৩০ জন। তখন এক শিফটে কুমিল্লা নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য থাকে মাত্র ১৫ জন। যারা সার্জেন্ট বা উপ-পরিদর্শক হিসেবে আছেন, তারা ঘুরে ঘুরে এই জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। এই জনবল দিয়ে শহরের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো খুবই কষ্টকর।’ ‘তারপরও শহরের যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন’- যোগ করেন তিনি।
ফুটপাত-সড়কে ভ্রাম্যমাণ হকারদের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা ছিন্নমূল হকার্স সমিতির সভাপতি হাসানুল আলম হাসান বলেন, ‘আমাদের সমিতির সবাই নিউমার্কেটের আন্ডারগ্রাউন্ডে ব্যবসা করে। ভ্রাম্যমাণ যারা রাস্তার উপর ব্যবসা করে, তাদের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। বরং তাদের কারণে আমার সমিতির হকাররা ক্ষতিগ্রস্ত।’
রাস্তা-ফুটপাতে অবৈধভাবে ঠাঁই নেয়া এসব ভ্রাম্যমাণ হকারের অপসারণ চান তিনি।





© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};