ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
Count
257
ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)
Published : Friday, 30 October, 2020 at 12:00 AM
ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) আবুল কাশেম হৃদয়।।
কুমিল্লার দারোগাবাড়ি মাজার শরীফ অতিপরিচিত একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান। এ মাজার শরীফে প্রতিদিনই ছুটে যান ধর্মপ্রাণ মানুষ। প্রতিবছর মাঘ মাসের প্রথম জুম্মা রাতে অনুষ্ঠিত ওরসে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল নামে। কিন্তু কেন ? জনশ্রুতি আছে, যাঁর কবরকে ঘিরে এই মাজার শরীফ, সেই কবর অল্প কিছুদিন পর পাকা করার সময় দেখা যায় কবরে কোন মরদেহ ছিল না, ছিল না কোন হাড় বা গন্ধও। শুধুমাত্র পায়ের কাছে কাফনের এক টুকরো কাপড় দেখা গিয়েছিল। জীবিত অবস্থায় গায়েবী নির্দেশে দুই জন অলি আল্লার জানাজায় ইমামতি করায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। মৃত্যুর পরও জীবদ্দশার কথা সত্য প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর কেরামত কাহিনী দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সেই প্রখ্যাত ধর্মীয় সাধক আর কেউ নন তিনি হযরত হাফেজ ক্বারী মাওলানা আলহাজ্ব শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)।
জানা গেছে, কুমিল্লা থেকে অন্তত দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে বর্তমান ভারতের মধ্য প্রদেশের গাজীপুরে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)। মিয়ানমারের রেংগুনে এক মসজিদের ইমাম ছিলেন তিনি। ১৮৯০ সালে দাউদকান্দি হয়ে নৌকায় ও গরুর গাড়িতে করে রেংগুনে যাওয়ার পথে অবস্থান করেন কুমিল্লার দারোগা বাড়িতে। এ বাড়ির ফরাসী ভাষায় সুপন্ডিত ও আলেম মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদের অনুরোধে এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ইসলামের সত্য বাণী প্রচারে ব্রতী ছিলেন। শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)এর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা দেখে অনেকেই তাঁর মুরিদ হন।
শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)এর সাথে প্রথম সাক্ষাতে আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে মৌলভী আশরাফ উদ্দিন আহমদ তাঁকে নিয়ে যান উত্তর চর্থার হোচ্ছামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায়। কুমিল্লার দক্ষিণ চর্থার নবাব বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব সৈয়দ হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরী খান বাহাদুর (১৮৬৮-১৯২১) ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তিনি ১৮৮৫ সালে হোচ্ছামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য তিন দশমিক ৮৩ একর জমি প্রদান করেন। সে মাদ্রাসায় প্রধান মোদারেছ ছিলেন মৌলভী ওয়াজেদ আলী। তিনি শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)কে দেখেই কদমবুচি করে মুরিদ হওয়ার জন্য মিনতি করেন। কোন কথা না বলেই মুরিদ হওয়ার ঘটনা দেখে সবাই চমকিয়ে যান। পরে আস্তে আস্তে সে মাদ্রাসার অধিকাংশ আলেম শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)এর মুরিদ হয়ে যান। আশপাশে অনেক সাড়া পড়ে যায়।
নোয়াখালীর রামগঞ্জে এক বহেছের মজলিশ হয়। অসংখ্য লোক লাঠি ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) একা খালি হাতে উপস্থিত হন। বহেছ চলা অবস্থায় বহেছ দেখার জন্য মানুষ উদগ্রিব। শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) দেখলেন জনতার সাজ সাজ রব। তিনি বললেন- আমি তো আল্লাহর নাম জারি করতে এসেছি। আপনারা লাঠি হাতে বহেছ করতে এসেছেন! আমার লাঠি তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আমার তলোয়ার তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আমার ঢাল তো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। তিনি জিকির করতে থাকেন। এই জিকিরে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অনেকে পালিয়ে যায়।
গায়েবী নির্দেশে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) দুই জন সুফী দরবেশ অলি আল্লাহর জানাজায় ইমামতি করেন। এই দুই জন হচ্ছেন ময়নামতীর পাশে হযরত হিলাল শাহ (র.) এবং মিয়ার বাজারের চাঁদশ্রীর হযরত শাহ ফয়জন মিঞা (র.)। সুফী দরবেশ হযরত হিলাল শাহ (র.) মৃত্যুর পূর্বে অছিয়ত করে যান একজন হিন্দুস্থানী আলেম তাঁর জানাজা পড়াতে আসবেন। তিনিই যেন তার জানাজা পড়েন।
একদিন রাতে কুমিল্লা শহরের দক্ষিণ চর্থার জমিদার নবাব সৈয়দ হোচ্ছাম হায়দার চৌধুরীর কাছে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) খবর পাঠান পরদিন সকালে যেন তাঁর ঘোড়ার টমটম গাড়িটি পাঠান। ভোরে কোচম্যান টমটম নিয়ে হাজির। কোথায় যাবেন হুজুর? কোচম্যানের এমন জিজ্ঞাসার উত্তরে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) বলেন- ময়নামতী যাবেন।  ময়নামতী যাওয়ার পথে লোকজন বলাবলি করছিল প্রসিদ্ধ আলেম হযরত হিলাল শাহ(র.) ইন্তেকাল করেছেন। শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) সেখানে গেলেন। মরদেহের মুখাবরণ তুলে দেখে তিনি বলেন উঠেন-তিনি একজন জবরদস্ত অলি আল্লাহ ছিলেন। উপস্থিত লোকদের অনুরোধে শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) তাঁর জানাজা পড়ান।
কুমিল্লার মিয়ারবাজারের চাঁন্দশ্রীর সুফী দরবেশ হযরত শাহ ফয়জন মিঞা (র.) মৃত্যুর সময় অছিয়ত করে যান এই বলে- দক্ষিণ দিক থেকে একজন পশ্চিম দেশীয় লোক আসবেন। তিনি যেন তাঁর জানাজা পড়ান।
হযরত শাহ ফয়জন মিঞা (র.) মৃত্যুর সময় ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের শিতলিয়া গ্রামে অবস্থান করছিলেন। জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য ঐ গ্রামের লোকজন চলে যান। জানাজায়ও মানুষ কাতারবদ্ধ হচ্ছেন। হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) সে সময় হুজুরাতে চলে যান। কিছুক্ষণ হুজুরাতে অপেক্ষার পর বের হয়ে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। বাড়ির সব পুরুষ চলে যাওয়ায় তিনি এক মহিলার কাছে উর্দুভাষায় জানতে চান চাঁন্দশ্রী কোন দিকে। বৃদ্ধ মহিলা কোনভাবে বুঝতে পেরে হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)কে চাঁন্দশ্রীর রাস্তা দেখিয়ে দেন। সেই রাস্তা ধরে চাঁন্দশ্রী পৌঁছার পর দেখেন বহু মানুষ জানাজায় কাতারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষমান। তিনি মরদেহের মুখের কাপড় সরানোর পর দেখেন মরদেহের মুখ হাসিতে ভরে উঠেছে। হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) মরদেহের হাসিমুখ হাত দিয়ে চেপে ধরেন। এই অস্বাভাবিক ঘটনা দেখে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়ে যান। উপস্থিত কারো কোন হুকুম না নিয়ে ঐ ধর্মীয় সাধকের জানাজা পড়েন হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)।
মৃত্যুর পূর্বে ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) বলেন-‘মরনের পর আন্ধার ঘরে কে থাকবে? আমিতো কখনই থাকবো না’। কি অবাক করা ঘটনা, হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) ১৯০৩ সালের ১৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে আটটায় দারোগা বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে (১২১১ হি.) রিয়াজ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দারোগা বাড়ি মসজিদ সংলগ্নে তাঁকে সমাহিত করা হয়। কবর দেওয়ার কিছু দিন পর রাজমিস্ত্রি চারদিক পাকা করার জন্য মাটি কাটার সময় কবরের একটি কোণের মাটি ভেঙ্গে যায়। কৌতুহল বশত: রাজমিস্ত্রি দেখলেন কবরে কোন মরদেহ নেই। নেই কোন হাড়ও। গন্ধও নেই। শুধু পূর্ব দক্ষিণ কোণে পায়ের কাছে এক টুকরো কাফনের কাপড় পড়ে আছে। এখবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষ তা দেখতে যায়। ধর্মীয় সাধক হজরত শাহপুরী (র.) বলেন- ‘মাজার শরীফের যে সুরঙ্গ তা দিয়ে বুক পর্যন্ত ভিতরে গিয়ে দেখলাম তাতে মরদেহ নেই। হাড় নেই। দুর্গন্ধও নেই’। এই অলৌকিক ঘটনায় বুঝা গেলো হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) যা বলেছিলেন তাই হয়েছে। তিনি কবর থাকবেন না, ছিলেনও না।
হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) কুমিল্লার উনাইসারে নিজের হাতে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি নির্মাণের পর তিনি সাত দিন চিল্লা করেন। সপ্তম দিনের দিন রাতে বজ্রধ্বনির মতো ধ্বনি হয় এবং অপরুপ জ্যোতি দেখা দেয়। পরদিন থেকে সে মসজিদে নামাজ পড়ার আদেশ হয়। হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.) সে মসজিদে ইমামতি করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল তাঁর মহদেহ সে মসজিদে পাশে সমাহিত করার।  কিন্তু দারোগা বাড়ির মানুষের ইচ্ছায় তাঁকে দারোগাবাড়ি মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়।

এই প্রখ্যাত ধর্মীয় সাধক হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী (র.)কে ঘিরে কুমিল্লা শহরে অবস্থিত দারোগা বাড়ি মাজার শরীফ ও মসজিদ। যা ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। তাঁর মাজার শরীফে প্রতি বছর ওরস উপলক্ষে হাজারো মানুষের ঢল নামে।

তথ্য সূত্র:
১. মকবুল আহম্মদ সংকলিত তপোধন, হযরত শাহ আবদুল্লাহ গাজীপুরী(র.), প্রকাশক শাহনূর চৌধুরী, জানুয়ারি ১৯৯৫।
২. আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া সম্পাদিত কুমিল্লা জেলার ইতিহাস, জেলা পরিষদ ১৯৮৪। ধর্মীয় সাধনা অংশ।
৩. এম এ কুদ্দুস, কুমিল্লায় স্মরণীয় বরণীয়, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ১৯৮৭






© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft
document.write(unescape("%3Cscript src=%27http://s10.histats.com/js15.js%27 type=%27text/javascript%27%3E%3C/script%3E")); try {Histats.start(1,3445398,4,306,118,60,"00010101"); Histats.track_hits();} catch(err){};