ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
দু‘টি কুড়ি একটি পাতা বিশেষ মর্যাদায় এখন বিশ্ব বাজারে
Published : Tuesday, 20 October, 2020 at 12:00 AM, Update: 20.10.2020 1:09:18 AM, Count : 314
দু‘টি কুড়ি একটি পাতা বিশেষ মর্যাদায় এখন বিশ্ব বাজারেদেশের সবচাইতে বেশি চা-বাগান রয়েছে শ্রীমঙ্গলে।যার জন্যে শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় চায়ের রাজধানী।বিভিন্ন কারনেই আমি আর বন্ধু ব্যরিষ্টার আলর্বাট বাড়ৈকে শ্রীমঙ্গলে যেতে হয়।তবে করোনা জেকে বসায় এবছর সেখানে আর যাওয়াই হয়নি।ফলে হুট করেই সেদিন চলে গেলাম শ্রীমঙ্গল।শহরটির বেশ জমজমাট অবস্থা।বেশ উৎসব মুখোরও বলা যায়।হিন্দু অধ্যুশিত এলাকা।ক‘দিন পরেই দুর্গা পূজা।বাজারে-দোকানে-শপিং মল সবখানেই জনগনের,চলাচলের ব্যস্থতা চোখে পড়ার মতোই।তার উপরে আবার চলছে জেলা পরিষদের উপনির্বাচনের প্রচার-প্রচারনা।যদিও এই নির্বাচন সরাসরি ভোটে হয়না।তারপরও আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী আর বিদ্রোহ প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারনে সর্বত্রই সরব আলোচনায় জমজমাট।
শ্রীমঙ্গলে এবারের সফরে চায়ের রপ্তানি থেকে শুরু করে এর মান বৃদ্ধিসহ নতুন সম্ভাবনার কাহিনী শুনলাম।বিশ্বব্যপীই বাংরাদেশের চায়ের চাহিদা বেড়েছে ।তবে সেই সাথে দেশে অভ্যন্তরিন চাহিদাও কিন্তু বেড়্ চেলেছে।যারজন্যে,চাহিদা থাকা সত্বেও সে অনুযায়ি চা রপ্তানি করা যাচ্ছে না বলে, চা উৎপাদনকারি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা সুত্রে জানা গেছে।করোনাকালিন বিভিন্ন প্ণ্য উৎপাদ-রপ্তনি নানা বিপর‌্যয়ের কারন হলেও, চায়ের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যতিক্রম।চা উৎপাদন এবং রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই এবার ইতবিাচক ফল পাওয়া গেছে।রপ্তানিকারক সুত্রে জানা গেছে,করোনার মধ্যে আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যে যে ক‘টি পন্যের চাহিদা বেড়েছে,তার মধ্যে আমাদের চা অন্যতম।
কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরলে বিষয়টি পরিস্কার বোঝা যাবে।এখানকার মালনীছড়া চা বাগানটি হলো দেশের প্রথম চা বাগান।আর তা প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৮৫৪ সালে।তারপর থেকে বৃহত্তর সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই এখন চা বাগান গড়ে উঠে।যার মোট সংখ্যা ১৬৩টি ।নথিপত্রে দেখা যায় যে,দেশে ২০১৬ সালে সবচাইতে বেশি চা উৎপাদিত হয়েছিলো।সেবছর ৮ কোটি কেজি চা,উৎপাদন হয়।যা ছিলো সব্বোর্চ উৎপাদনের রেকর্ড।আর গত বছর অথ্যাৎ ২০১৯ সালে উৎপাদিত হয়েছে সাড়ে ৯ কোটি কেজি চা।যা এর আগে আর কখনো উৎপাদিত হয়নি।অন্যদিকে’ ১৮-১৯ অর্থ বছরে চা রপ্তানি হয়েছিলো ২ দশমিক ৮২ মিলিয়ন ডলার। আর করোনর মধ্যেও ‘১৯-২০ সমাপ্ত অর্থ বছরে চা রপ্তানির আয় হচ্ছে ৩ দশমিক ১মিলিয়ন ডলার। আয় প্রবৃদ্ধির পরিমান হচ্ছে ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।বিস্মকর বিষয় হলো চলতি অর্থ বছরে প্রথম মাসেই এই প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১০০ শতাংশ।এই প্রবৃদ্ধির কারন হচ্ছে চা-রপ্তানিকারক অনেক দেশেই লকডাউন প্রলম্বিত এবং সংক্রামনের হার বৃদ্ধি থাকায় উৎপাদন ব্যহত হয়েছে।তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারত। চা উৎপাদনে চীন ও ভারত প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছ। বাংলাদেশ ছিলো দশম স্থানে। করনাকালে এক ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ নবমে উঠে এসেছে।বিদেশে প্রচুর চাহিদা আর সম্ভাবনা থাকলেও, দেশের অভ্যন্তরিন চাহিদাও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন দেশে, বাংলাদেশের চায়ের চাহিদাযে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের চাহিদা মিটিয়ে সে পরিমানে রিপ্তানি করা যাচ্ছেনা। এক্ষত্রে ২০১৮ সালের উদাহরন দিয়ে সংশ্লিষ্ট জনেরা জানাচ্ছেন,সেসময় দেশের চাহিদা ছিলো ৮দশমিক ৬ কেজি। আর উৎপাদন ছিলো ৮ দশমিক ২ কেজি। ফলে সে বছর চা আমদানি করতে হয়েছিলো ।
বাধ্য হয়ে কতৃপক্ষকে নতুন নতুন কৌশল আর পরিকল্পনা নিতে হচ্চে। আর তারই সম্ভাবনাময় ফসল হচ্ছে ‘হোয়াইট টি‘। এতদিন আমরা ব্লাক বা গ্রিন টি শুনেই অভ্যস্থ ছিলাম।এবার সাদা চা বা ‘হোয়াই টি‘ উৎপাদনের সাফল্য দেখিয়েছে শ্রীমঙ্গলের কমলগঞ্জের একটি চা বাগান। বাগানটির নাম চাম্পারায় চা বাগান।এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ন্যশনাল টি কোম্পানী‘এর নিয়ন্ত্রনাধিন একটি বাগান। কমলগঞ্জের আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক,মৌলভীবাজার জেলার পিপি,আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধু এডভোকেট আজিজুর রহমান আযাদের সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি নির্বাচন নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্থ, তারপরেও কথা বলেছেন।তিনি, হোয়াইট টির প্রচুর সম্ভাবনার কথা বলেন। বর্হিবিশ্বে এই চা‘সিলভার নিডল গ্রেডের টি‘ নামে পরিচিত। এই বাগানে পরীক্ষামূলক ভাবে উৎপাদন করায়,অল্প পরিমানে উৎপাদন হলেও এর মূল্য অনেক বেশি প্রাপ্তি।তাছাড়া আর্ন্তজাতিক ভাবে এর চাহিদাও অনেক বেশি বলেও জানা গেছে।।গত জুলাইতে এর প্রমানিত মিলেছে।সেসময় মাত্র ১০ কেজি চা,আর্ন্তজাতিক বাজারে নিলামে তোলা হয়েছিলো।এর দাম উঠেছিলো প্রতি কেজি আড়াই হাজার টাকা।
এই চা-অত্যন্ত সতর্কতা এবং যতœসহকারে উৎপাদন করতে হয়। তুলতেও হয় বাছাই এবং যতœ করে।গাছের অগ্রভাগের শুধুমাত্র নরম-কোমল কুড়িঁ সংগ্রহ করতে হয়। সব মাটিতে বা বাগানে তা পাওয়া যাযনা। ফলে এই কুঁড়ি সংগ্রহ অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ।তারপর সংগ্রহকৃত কুড়ি একটি কক্ষের নিদৃষ্ট তাপমাত্রায় এই চাপাতা দুই/তিন দিন ধরে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।এমনি যতœ,সতর্কতার মাধ্যমে চা উৎপাদনের কারনে চায়ের উৎপাদন মূল্য বেশি পড়ে।মজার ব্যপার হলো,, নাম হোয়াই টি বা সাদা চা হলেও এই চায়ের রঙ কিন্তু পুরোপুরি সাদা নয়। অনেকটা গ্রিন টির মতো। তবে গরম পানিতে চা দিলে এটা রূপালী আভার মতো মায়াবি রং ধারন করে।এই চা,প্রথমবারের মতো ঐ বাগানে উৎপাদনের পর এর মূল্য আর অভাবনীয় সাড়া পড়ায়,সরকারি ভাবে হোয়াই টি উৎপাদনের জন্যে একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলেও জনাব আযাদ জানান।
দু‘টি কুড়ি একটি পাতা বিশেষ মর্যাদায় এখন বিশ্ব বাজারেবিশ্বে বিখ্যাত এই সিলভার গ্রেডের চা চীনের ফুজিয়ান প্রদেশে বেশি উৎপাদিত হয়। ফলে এই চা,চায়না হোয়াইট টি বা ফুজিয়ান হোয়াইট নামেই পরিচিতি লাভ করেছে। যদিও ভারত,পূর্ব নেপাল,তাইওয়ান,উত্তর থাইল্যন্ড ও দক্ষিন শ্রীলঙ্কায় এই চায়ের আবাদ হয়।আর সহসাই এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও যুক্ত হতে যাচ্ছে।
এইযে দুটি কুঁড়ি একটি পাতা থেকে তৈরী চা-এর এই সাফল্যের নেপথ্যে যারা অমানুষিক শ্রম ব্যয় করছেন, তাদের কথা কিছু বলি।দেশের ১৬৩টি চা বাগানে সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী চা শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ২২ হাজার।এখন আরো অনেক বেশি।এদের মধ্যে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৭৫%।চা তোলার ক্ষেত্রে মহিলাদের কোমল হাত দ্রুততার সাথে পাতা তোলাসহ অন্যান্য পরিচর্যার কজে পারদর্শী বলেই তাদের সংখ্যও বেশি।আর তারা ক্ষুদ্র নি-গোষ্ঠীর লোক।তাদের বেতন দৈনিক হারে নগদ পরিশোধ করা হয় বটে।তবে তা মোট প্রাপ্যতার খুব কম অংশই।বতর্মানে তারা দৈনিক ১০২ টাকা হারে নগদ পায়।তবে বাগান ভেদে এর তারতম্য রয়েছে।বেতনের বাকি অংশ লাভ করে চাল/আটা,আবাসন, চিকিৎসা,লেখাপড়া ইত্যাদি বাবদ, কতৃপক্ষের নিজস্ব নীতি অনুযায়ী রেশন বা অন্য সুযোগসুবিধা আকারে তা প্রদান করা হয়।
তাঁদের এই বঞ্চনার প্রথাটি বৃটিশ আমল থেকেই চলে আসছে।‘ টি: দি ড্রিংক দেট চেইঞ্চ দি ওয়ার্ল্ড‘ নামক গ্রন্থে পাওয়া যায় সেই ইতিহাস।সেখানে দেখা যায় যে,১৮৮০ এবং ১৮৯০ সালে আসাম( তখন সিলেট বিভাগ আসামের অংশ ছিলো)এর চা শ্রমিকদের মাসিক উপার্যন ছিলো ৬ টাকা।তখন ২টাকায় এক মন চাল পাওয়া যেতো।কিন্তু অন্যান্য খরচ বাবদ ব্যয় করে শ্রমিকদের চালের জন্য একটাকার বেশি খরচ করার সামথ্র্ ছিলোনা।ফলে মালিক পক্ষ তাদের নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে বাজার মূল্য থেকে কম মূল্যে চালসহ অন্যন্য সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয় উৎপাদন ঠিক রাখার স্বার্থে।তবু তার বেতন বৃদ্ধি করে না।সেই থেকেই চা শ্রমিকরা তাদের প্রাপ্য বেতনের অংশ বিশেষ নগদ পায়, বাকিটুকু ভর্তূকী চাল বা আটাসহ অন্যান্য সুবিধা আকারে পেয়ে থাকে।তাদের বেতন-সুবিধাদি দেখার আইনগত কোন সংস্থা ছিলোনা। তবে তাদের জন্যে প্রথম ওর্য়েজ বোর্ড গঠিত হয় ‘৮২ সালে।২০০৯ সালে এসে আওয়ামীলীগ সরকার দ্বিতীয় ওর্য়েজ বোর্ডের মাধ্যমে তাদের দৈনিক বেতন নির্ধারন করে ৩২.৫০ পয়সা।‘১৫ সালে এ,বি এবং সি শ্রেণীভূক্ত বাগান ভেদে ৮২ থেকে ৮৫ টাকা বেতন নির্ধরন করা হয় ।সেই সাথে প্রথমবারের মতো বেতনসহ সাপ্তাহিক ছুটি নির্ধারণ করা হয়।এখনো তাই বিরাজমান রয়েছে। কিন্তু শ্রমের তুলনায় এই পারিশ্রমিক খুবই কম। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে,চা বাগানের পরিবারগুলো এখনো দরিদ্রসীমান নিচে বাস করে। তাদের সংখ্যা শতকরা ৭৪ জন।
দু‘টি কুড়ি একটি পাতার উৎপাদন বেড়েছে ,বেড়েছে মান,রপ্তনিও। যারা তাদের শরীরে রক্ত পানি করে এই বাড়ন্ত বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনসহ আমাদের রুচির চাহিদা মিটেয়ে যাচ্ছে।সেই দরিদ্র চা-শ্রমিকদের কথও ভেবে দেখার সময় এসেছ।




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০১৮
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ই মেইল: [email protected], [email protected],  Developed by i2soft
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আবুল কাশেম হৃদয়
নির্বাহী সম্পাদক: হুমায়ূন কবীর জীবন
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন
কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ। বাংলাদেশ। ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩
ইমেইল : [email protected] Developed by i2soft