শনিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
১০ ফাল্গুন ১৪৩১
ভাষার ভূমিকা
জুলফিকার নিউটন
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১:৩৩ এএম আপডেট: ১৯.০২.২০২৫ ১:৫০ এএম |


ভাষার ভূমিকা
পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী যার আত্মপ্রকাশের ভাষা আছে। মানুষ অর্থবহ ধ্বনি উচ্চারণ করে এবং আপন অভিব্যক্তিকে প্রকাশ করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অবস্থায় এই সমস্ত ধ্বনির অর্থ চিহ্নিত হয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে তা মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্মাণে সহায়তা করেছে। মানুষ যে শব্দ উচ্চারণ করে তার মধ্যে ইঙ্গিতময়তা আছে, বিশ্বাস আছে, অঙ্গীকার আছে, অহমিকা আছে এবং নিজেকে প্রকাশ করবার আবেদন আছে। প্রথম মানুষ হযরত আদমকে আল্লাহতায়ালা নির্মাণ করেছিলেন, তাঁকে তিনি ভাষা দিয়ে, পূর্ণ জ্ঞান দিয়ে নির্মাণ করেছিলেন। তাঁকে আল্লাহতায়ালা সকল প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বস্তুর নাম শিখিয়েছিলেন। এই সমস্ত নামের অধিকারে সম্পূর্ণ মানব হয়ে আল্লাহতায়ালার হাতে তিনি যখন গঠিত হলেন তখন আল্লাহতায়ালা সকল ফেরেশতাকে তার সামনে প্রণত হতে বললেন। সকল ফেরেশতা প্রণত হলো, একমাত্র ইবলিশ ছাড়া। ইবলিশ গর্ব করে বলল যে, সে হচ্ছে আগুনের তৈরি এবং আদম হচ্ছেন মাটির তৈরি, সুতরাং মাটিতে প্রস্তুত কোনো পদার্থের কাছে অগ্নি কখনও নতি স্বীকার করতে পারে না। কিন্তু ইবলিশ আদমের সৃষ্টি-রহস্যের মূল তত্ত্বটি অনুধাবন করতে পারেনি। আদম সকল নামের অধিকারী হয়েছিলেন। অর্থাৎ জ্ঞাত-অজ্ঞাত সকল ভাষার সারাৎসার তিনি লাভ করেছিলেন। আদমের এই ভাষাজ্ঞান লাভের মধ্য দিয়ে আমরা মাতৃভাষার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারি।
মাতৃভাষার সাহায্যে মানুষ সকল বস্তুর নাম উচ্চারণ করে, পার্থিব সকল বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে এবং অপার্থিব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে। একটি পাখি তার চঞ্চুতে তার উচ্চারণকে ধরে রাখে, তেমনি একটি মানুষ তার ওষ্ঠে শব্দকে ধারণ করে। তাই এজরা পাউন্ড বলেছেন, “ভাষা হচ্ছে ওষ্ঠলালিত জীবনের কাকলী।” ভাষার কোনো অপচয় নেই, ভাষা কখনও নিঃশেষ হয় না, ভাষা চিরকাল জাগ্রত থাকে। পাখির কলকাকলী যেমন রুদ্ধ করা যায় না, ভাষার কলকণ্ঠও তেমনি অবিনশ্বর। সময়েঅসময়ে, আঘাতে-প্রতিঘাতে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভাষা প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ভাষা হচ্ছে। মানুষের অস্তিত্বের স্মারক; মানুষের অস্তিত্বকে ধারণ করে রাখে ভাষা। সে যে মানুষ হিসেবে চিহ্নিত, চিত্রিত এবং বিকশিত তার প্রমাণ আমরা পাই তার ভাষার মধ্য দিয়ে। অন্য প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য এখানে যে, মানুষের প্রশ্ন আছে, এবং আপন অস্তিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা আছে। এই জিজ্ঞাসাটি ভাষার সাহায্যে রূপ লাভ করে। একটি প্রস্তর খণ্ডের অবস্থান আছে, যে অবস্থানকে বিশ্লেষণ করা যায়, একটি বৃক্ষের বিকাশ আছে যা আবিষ্কার করা যায়, একটি প্রাণীর বোধ আছে যে বোধের প্রতাপে সে জীবন্ত থাকে। কিন্তু একজন মানুষের এ সমস্ত কিছুর অতিরিক্ত একটি জিজ্ঞাসা আছে যা কখনই বিশ্লেষণ করা যায় না। এই জিজ্ঞাসা একমাত্র রূপ লাভ করে ভাষার সাহায্যে। এই জিজ্ঞাসাই মানুষকে তার অস্তিত্বের তাৎপর্য দিয়েছে, বিশ্বাসের অনুভূতি দিয়েছে এবং আনন্দের অভিজ্ঞান দিয়েছে।
বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষা আমাদের জাগ্রত চৈতন্যের ভাষা, আমাদের অতীতের ইতিহাসের ভাষা, আমাদের ভবিষ্যতের আনন্দ, অনুজ্ঞা এবং প্রত্যয়ের ভাষা। এ ভাষার বিরুদ্ধে যখন আঘাত এসেছিল তখন সংঘবদ্ধ হয়ে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম।
আমাদের প্রতিবাদটা ছিল অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিবাদ। একটি জাতি তার ভাষাকে হারিয়ে ফেললে সে অস্তিত্বহীন হয়। এই অস্তিত্বহীনতা থেকে মুক্তির জন্য আমরা সংগ্রাম করেছিলাম। এদেশের মানুষ ফারসি ভাষা শিখেছে, আরবি শিখেছে, ইংরেজি শিখেছে। কিন্তু এদেশের মানুষ আপন অস্তিত্বের সর্বস্ব নিয়ে বাংলা ভাষার মধ্যে বর্ধিত হয়েছে। এই ইতিহাসটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি এক সময় লিখেছিলাম, শব্দের অর্থ কবিরা নির্মাণ করেন না, আবিষ্কার করেন ভাষাকে আমি আমার জাতির চৈতন্যোদয়ের কুশল সম্ভাষণ বলে মনে করি। যেমন আমাদের ত্বক, শরীরের সঙ্গে স্বাস্থ্য, জীবন ও স্পর্শের অনুভূতি নিয়ে সংলগ্ন, তেমনি আমাদের ভাষা আমাদের, জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে বিজড়িত। জার্মান ভাষায় যাকে বলা হয়, তার চঞ্চুর মধ্যে যেভাবে গড়ে উঠেছে, ভাষা সেভাবেই জাতির ওষ্ঠ লালিত জীবনের কাকলী। শব্দ তার শিকড় নিয়ে, পারিপার্শ্বিক পরিচয় নিয়ে এবং সর্বযুগের ব্যবহারের স্মৃতি নিয়ে একজন কবি’র কাছে অনবরত আবিষ্কার হতে থাকে।
শব্দ হচ্ছে দাবা খেলার গুটি। একটি বিশেষ মুহূর্তে জাতির স্মৃতিতে যতগুলো শব্দ আছে তা নিয়ে তার বহু বিচিত্র কথার খেলা। নতুন শব্দ যোগ করা চলে না, পুরাতন শব্দকে অস্বীকার করা যায় না। আমরা আয়ত্তগত শব্দের সামগ্রীকে অনবরত নব নব বিন্যাসে নতুন নতুন উপলব্ধির স্মারক করে তুলি।
কোনো একটা বস্তুর নাম যখন আমাদের জাগে, তখন সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো বিশ্লেষণ নিয়ে নামটি উদ্ভাসিত হয়। এভাবে শব্দার্থের ব্যপ্তি এবং পরিমাপ সংবেদনশীল মনের কাছে সর্বমুহূর্তেই ধরা পড়েছে। এ ব্যপ্তি এবং পরিমাপের মধ্যে দুটি বিপরীতধর্মী বিশ্লেষণ অর্থ প্রসারের দুই প্রান্ত নির্ধারিত করে। যখন আমি রমণী’ শব্দটি উচ্চারণ করি তখন সে নামটিকে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ করি। শব্দার্থের কৌশল নিয়ে যাঁরা আলোচনা করেছেন তারা বলেন প্রতিটি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সাতটি পর্যায়ক্রম আছে। যেমন অত্যন্ত সুন্দরী রমণী, সুন্দরীও নয় অসুন্দরীও নয় এমন রমণী, কুৎসিত রমণী, বেশ কুৎসিৎ রমণী, অত্যন্ত কুৎসিৎ রমণী। এভাবে অন্যান্য বিশ্লেষণ দিয়েও মোটামুটি সাতটি পর্যায়ক্রমের মধ্যে নামটিকে আলোড়িত করা যায়।
আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি সে পৃথিবী হচ্ছে বিজ্ঞানের এবং পর্যাপ্ত সামগ্রীর। আমাদের সমস্ত কর্ম ও উপলক্ষ এ পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েই মূল্যবান হয়। অজস্র ইচ্ছা এবং প্রয়োজনের যে সম্ভারে আমরা প্রতিদিন বেঁচে থাকি আমাদের দৃষ্টির দ্বারা তারা সর্বদাই চিহ্নিত হচ্ছে। তাই আমরা যখন শব্দে আমাদের সকল ইচ্ছা এবং প্রয়োজনকে তুলে ধরবার চেষ্টা করি তখন বোধকে দৃষ্টির সীমায় টেনে আনি। দৃশ্যগোচর হয়ে কোনো বস্তুই উপলব্ধির সম্পদ হতে পারে না। তাই দৃশ্যগোচরকেই আমরা দেখি না, অদৃশ্যকেও আমরা দেখি, শ্রুতিগ্রাহ্যকেও আমরা নয়নে নির্ণয় করি।
সমাজ হচ্ছে শব্দ-বৈচিত্র্যের লীলাভূমি। মানুষের অনবরত সংলাপ, জিজ্ঞাসা, ইচ্ছা, অহমিকা, বেদনা প্রতিদিন উচ্চারিত ধ্বনিকে ইঙ্গিতবহ করছে। আমরা যদি কখনই আমাদের কর্মে ও ইচ্ছায় সমাজবিমুখ হই, তাহলেও সমাজ আমাদের অনুসরণ করবে ভাষা হয়ে; কখনও জাগরণে কখনও স্বপ্নে। শব্দ চিরকাল সমাজ ও সভ্যতার স্মৃতিকে ধারণ করে আছে, শব্দ হচ্ছে একটি জাতির ইতিহাস এবং বিবেকের সাড়া। যিনি চিরকাল আকাশে শব্দ ছড়াতে চান তিনিও তার শব্দকে মানব সমাজের চেতনার আড়ালে নিতে পারেন না। প্রতিদিনের গতিবিধিতে যতটা অঞ্চল আমরা পরিক্রমণ করি শব্দরূপে আমাদের ইচ্ছাগুলো তার চেয়েও অধিক অঞ্চল পরিক্রমণ করে। কিন্তু যেহেতু তা শব্দরূপে এবং যেহেতু শব্দ সকল মুহূর্তেই সমাজের অনুভূতির উত্তাপ, তাই আমাদের সকল ইচ্ছা, কল্পনা ও স্বপ্ন আমাদের সমাজ এবং সভ্যতার উৎপ্রেক্ষা মাত্র। আমরা প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে আমাদের আপনাপন ভাষায় কথা বলি, সর্ব প্রকার মনোভাব প্রকাশ করি। কখনও উষ্ণ কখনও স্থিরতাকে শব্দে নির্ণয় করি। কিন্তু এ সমস্ত কিছুই সাধারণভাবে ঘটে, শব্দ ব্যবহারটি আমাদের পরীক্ষা অথবা বিচার-বিবেচনার আয়ত্তে আসে না। এ কারণেই এজরা পাউন্ড বলেছিলেন, একটি পাখির চঞ্চুতে তার নিজস্ব ধ্বনি যেভাবে গড়ে ওঠে, একজন মানুষের ওষ্ঠে তেমনি তার মাতৃভাষার শব্দ গড়ে ওঠে। পাউন্ডের ভাষায় ‘মাতৃভাষা হচ্ছে ওষ্ঠলালিত জীবনের কাকলী।' কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমরা বড় হয়ে ক্রমান্বয়ে ভাষাকে বিবেচনার আয়ত্তে আনি এবং পরীক্ষা করে জানতে চাই। কখন কিভাবে ভাষাকে আমরা প্রয়োগ করি। এভাবেই ব্যাকরণ সৃষ্টি হয়েছে, ভাষার রীতিনীতি বিধিবদ্ধ হয়েছে।
মানুষের জীবন তার ভাষার সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ। ভাষাকে গ্রহণ করেই মানুষ, মানুষের প্রকাশ, মানুষের অভিব্যক্তি, মানুষের অগ্রসরমানতা, মানুষের জীবনযাপন সব কিছুই কিন্তু তার ভাষাকে কেন্দ্র করে। অবশ্য সমগ্র পৃথিবীতে একই ভাষা বিদ্যমান নেই । বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন ভাষার উদ্গম হয়েছে, পারিপার্শ্বিকতার কারণে, আবহাওয়ার কারণে এবং একটা সীমাবদ্ধতার কারণে। সীমাবদ্ধতার ফলেই এক-একটি ভাষার প্রকাশ-রূপ এক এক রকম হয়ে থাকে। কিন্তু গুরুতরভাবে আমরা যদি পরীক্ষা করি এবং বিবেচনা করি তাহলে দেখতে পাই, মানুষের যে অভিব্যক্তিগুলো সে অভিব্যক্তি সর্বক্ষেত্রেই এক। বেদনার অভিব্যক্তি, আনন্দের অভিব্যক্তি, উল্লাসের অভিব্যক্তি, হতাশার অভিব্যক্তি যত রকম অভিব্যক্তি আছে সেই অভিব্যক্তিগুলো কিন্তু সব জায়গায় একই। কিন্তু অভিব্যক্তির ভাষার রূপ এক এক অঞ্চলে এক এক রকম। তাহলে আমার বক্তব্য যেটা সেটা হচ্ছে এই, মানুষ ভাষাকে গ্রহণ করেই বেঁচে থাকে, ভাষাকে গ্রহণ করেই তার উপলব্ধি, ভাষাকে গ্রহণ করেই তার স্বস্তি এবং তার সন্ত্রম, তার প্রকাশ। ভাষাকে অস্বীকার করে কোনো মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে একটা কথা বলা যায় যে, বহুদিন, বহু আগে থেকেই বাংলা ভাষার উদ্ভব যখন, তখন থেকেই বাংলা ভাষার কবি এবং সাধকরা এ ভাষার উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং এ ভাষার মাধ্যমে তাদের ধর্মীয়বোধকে, তাদের চিন্তাকে তারা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।
এই যে ভাষা, আমরা আমাদের জীবন-কথা অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের জীবন-কথা যদি আলোচনা করি তাহলে আমরা দেখতে পাই আমাদের বিকাশের প্রথম সময় থেকেই অদ্যবধি আমরা আমাদের মাতৃভাষার প্রতি খুবই গুরুত্ব আরোপ করেছি। এবং এই মাতৃভাষার মধ্যে দিয়েই আমাদের জীবনের প্রকাশ, জীবনের প্রতিষ্ঠা, জীবনের অগ্রসরতা। এই মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে আমরা কখনো নিজেদের প্রকাশ করতে পারব না, আর নিজেদের কখনো গুরুত্ব দিতে পারব না। আমরা দেখেছি আলাওল মাতৃভাষায় যে কাব্য রচনা করলেন বাংলা কাব্য, সেটা একটা অসাধারণ, অনন্য সাধারণ কাব্য হয়ে দাঁড়াল। সেই পদ্মবতী, পদ্মাবতীর মধ্যে তিনি যদিও সুফীতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করবার প্রয়াস পেয়েছেন কিন্তু সেখানেও দেখা যায় এবং সেখানে রাজা, রাণী এবং রাজদরবারের অমাত্যদের কথা আছে। কিন্তু এ কথার মধ্য দিয়েও সাধারণ মানুষ এসে উপস্থিত হয়েছে। এবং সাধারণ মানুষকে কাছে টেনে নেয়ার একটা প্রয়াস আলাওল করেছেন। এভাবে দেখা যায়, বাংলা ভাষা আদি থেকেই মানুষের ভাষা, সাধারণ মানুষের ভাষা। বাংলা ভাষা এমন কোনো ভাষা নয়, যে ভাষায় সাধারণ মানুষের ভাষার উচ্চারণের সঙ্গে অন্য উচ্চারণ মিলবে না। কথাটা হচ্ছে, আর একটু সুস্পষ্টভাবে বলি, অর্থাৎ আমরা দেখতে পাই অতীতে শালীন-সম্রান্ত একটা ভাষার উচ্চারণগত রূপ ছিল। আবার সাধারণ মানুষের উচ্চারণেরও একটা রূপ ছিল। তাই যখন সংস্কৃত ভাষা এ দেশে প্রচলিত হলো, সাহিত্যের ভাষা হিসাবে ভারতবর্ষে, তখন দেখা যায় এ ভাষায় কিন্তু সাধারণ মানুষ কথা বলত না। 
আমি একটি ইতিহাসের কথা বলব, ইউরোপের, সেটা হচ্ছে বুলগেরিয়ার । বুলগেরিয়া বহুদিন পর্যন্ত ওসমানী তুর্কীর অধিকারে ছিল। তুর্কীরা বুলগেরিয়াকে শাসন ফরত বুলগেরিয়ায় স্বায়ত্তশাসন বলতে কিছু ছিল না। পুরোপুরিভাবে তুরস্ক থেকে এদের শাসন করা হতো, তুরস্কের বিভিন্ন অঞ্চলের লোক গর্ভুর নিযুক্ত করত। এবং সেখানে তারা যে ভাষণ আরম্ভ করেছেন, যে ভাষা প্রয়োগ করেছেন সে ভাষা হচ্ছে। তুর্কী ভাষা, আরবি হরফে লেখা। পুরনো দলিল-পত্রের মধ্যে এর নিদর্শনগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু যখন স্থানীয় অধিবাসীরা, তারা ওসমানী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম আরম্ভ করল, তখন তাদের ভাষার প্রয়োজন হলো। তখন তারা তো তুর্কীদের ভাষায় কথা বললে, তুর্কীরা জানতে পারবে। সুতরাং তাদের গির্জার মধ্যে দু’জন গির্জা-ভ্রাতাপাদ্রী-ভ্রাতা নেথোডিয়াস এবং কিরিল– এরা দু’জন গোপনে একটা লিপি তৈরি করলেন। সেই লিপিটার, গ্রীস লিপির সাথে কিছুটা মিল আছে। রুশ লিপির সাথেও বর্তমানে কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারা অনেকগুলো হরফ এবং ধ্বনির শব্দরূপ আবিষ্কার করেছিলেন। এগুলো করে তারা নিজেদের শ্রাবণিক ভাষায়, বুলগেরীয় ভাষায়, চিঠিপত্র লিখে এক গির্জা থেকে অন্য গির্জায় পাঠালেন। এবং তুর্কী শাসকরা এগুলোতে বাধাও দেয়নি। কারণ তারা পড়তেও পারেনি, তাই এগুলোয় বাধাও দেয়নি। এভাবে করে আস্তে আস্তে সমগ্র দেশে তুর্কীদের বিরুদ্ধে, ওসমানী রাজ্য শাসনের বিরুদ্ধে একটা বিক্ষোভ তৈরি হলো। এ বিক্ষোভটি চরমে পৌঁছে তুর্কী শাসকদের অজ্ঞাতসারে এবং শেষ পর্যন্ত ওসমানীয় তুর্কীরা পরাজিত হয়। অবশ্য পরাজিত হওয়ার আরও কতকগুলো কারণ ছিল। কারণ রুশরা বুলগেরীয়দের সাহায্য করেছিল। খ্রিস্টান সম্প্রদায়, সকলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে দন্ডায়মান হয়েছিল ইত্যাদি অনেক কিছু আছে। তবে মানুষকে সংঘবদ্ধ করবার এই যে একটা প্রবণতা বুলগেরীয়দের, সেই প্রবণতার পেছনে ভাষায় একটা অঙ্গীকার আছে। আমরা মনে করি ভাষা এবং নিজস্ব ভাষার একটা লিপিরূপ, একটা অঙ্গীকার আছে। এই দিবসটি ওরা প্রত্যেক বছরই পালন করে। এরা স্মরণ করে কিরিল-কে এরা স্মরণ করে নেথোডিয়াসকে। এই লিপির নাম হচ্ছে কিরিলিক লিপি। কারণ কিরিলের নাম থেকেই কিরিলিক লিপি হয়েছে।
বাংলাদেশে আমরা যখন শহীদ দিবস, ভাষা দিবস পালন করি একুশে ফেব্রুয়ারি, তেমনি বুলগেরীয়রাও কিন্তু তাদের একটি ভাষা দিবস পালন করে। এই ভাষা দিবসে ঐ প্রাচীন কাহিনীগুলো তারা স্মরণ করে। আনন্দ-উৎসব করে সমস্ত রাস্তায় রাস্তায়, গ্রামে-গ্রামে, অঞ্চলে-অঞ্চলে। আমাদের যে একুশে ফেব্রুয়ারি উৎসবটা, আনন্দটা, একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন, সেই আন্দোলনের পেছনের কারণটা ছিল নিজের ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা এবং ভাষাকে মর্যাদা দেওয়া। কারণ তখনকার দিনে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম এটা যে, আমাদের এই ভাষা যদি আমাদের রাজভাষা না থাকে, রাষ্ট্রীয়ভাষা থাকে বাংলা ভাষাকে ব্যাখ্যা করার, তাহলে আমরা অর্থনৈতিক দিক থেকে নিপীড়িত হবো, রাজনৈতিক দিক থেকেও নিষ্পেষিত হবো। সেই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজের ভাষাকে আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে। এই ভাষাকে আঁকড়ে ধরেই, এই ভাষার মাধ্যমে আমরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারব। সেই জন্যই এই আন্দোলনটা। প্রথম থেকেই এই আন্দোলনটা যে সর্বসাধারণের আন্দোলন ছিল তা নয়। কিন্তু ক্রমশ এই আন্দোলন সর্বসাধারণ গ্রহণ করে বসল। একটিমাত্র কথায়, একটিমাত্র বিষয়ের জন্যে, সেই বিষয়টা হচ্ছে- ভাষা জীবনের অঙ্গীকারকে বহন করে। যেহেতু ভাষা জীবনের অঙ্গীকারকে বহন করে সুতরাং মাতৃভাষা, সেই মাতৃভাষা যদি আমার না থাকে, মাতৃভাষার উপর যদি আমার অধিকার না থাকে, তাহলে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। এখন আমরা যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন, আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে দেখি, তাহলে আমরা দেখতে পাই এখানে বহু জাতি আছে, মুসলমান জাতিরা আছে অনেক। যেগুলো পরবর্তীকালে স্বাধীন হয়ে গেল। এদের ভাষা ছিল আলাদা। আর রুশ ভাষা ছিল রুশ দেশে। এই রুশ ভাষা এবং শ্রাবণিক লিপি তারা সকলের উপর আরোপ করে দিল। দলিল দস্তখত রুশ ভাষায় হতে লাগল। এর বিরুদ্ধেও মানুষের বিক্ষোভ ছিল।
আজ যে অঞ্চলগুলো স্বাধীন হয়ে গেল- তার একটি মাত্র কারণ যে, এদের কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিল তারা। তাদের উপর একটা ভাষা আরোপ করে, যে ভাষা তাদের নিজের ভাষা ছিল না। সুতরাং আমাদের উপরে যখন অন্য ভাষা আরোপের একটা প্রয়াস করেছিল, তার পেছনে একটা বিরাট ইতিহাস আছে, সেই ইতিহাস আমি এখানে পর্যালোচনা করব না। সেই যে একটা চেষ্টা নিয়েছিল সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা সংঘবদ্ধ হয়েছিলাম। আমি সব সময় একটি কথা বলে থাকি, আমাদের যে ভাষা আন্দোলনটা, এই ভাষা আন্দোলন কিন্তু আমাদের আত্ম-আবিষ্কারের আন্দোলন। আমরা কিন্তু এর আগে, বহু আগে নিজের ভাষার কথা ভেবেছি সত্য কিন্তু এত গভীরভাবে ভাষাকে আমাদের মর্মমূলে অতীতে কখনো নেইনি। এই ভাষা আমরা শিখব কিন্তু আমাদের নিজস্ব ভাষা আমরা এই কারণে গ্রহণ করব যে, এই ভাষার মধ্য দিয়ে আমাদের যথার্থ চিত্তের স্ফুর্তি ঘটবে। অন্য কোনো ভাষার মধ্য দিয়ে সেটা কখনো ঘটবে না।
যে ভাষাকে আমরা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে ব্যবহার করি, স্বপ্নে যে ভাষার সাহায্যে আমাদের চিত্তলোক জাগ্রত হয় এবং প্রার্থনায় স্বস্তি পাবার জন্য যে মাতৃভাষাই আমাদের যথার্থ অবলম্বন, সেই ভাষাকে বিশুদ্ধ এবং সুন্দরভাবে প্রয়োগ করার জন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। প্রতিদিনের দৃশ্যমান বস্তু দৃশ্যে যেমন ধরা পড়ে না তেমনি প্রতি মুহূর্তের উচ্চারণ নিয়ে আমরা বড় একটি ভাবি না। কিন্তু ভাবতে হয় কেননা তা না হলে জীবনকে অর্ঘ্যদান করা যায় না। মানুষ যখন সাহিত্য সৃষ্টি করে, যখন কবিতা লেখে বা গল্প লেখে, তখন ভাষাকে সে আবিষ্কার করতে চায়। এই ভাষাকে আবিষ্কার করতে গিয়ে। আমরা একদিন আমাদের স্বদেশকে পেয়েছি, এখন আমাদের চেষ্টা হবে এ ভাষার মধ্য দিয়ে আমাদের হৃদয়কে পেতে। আমরা আমাদের ভাষার সৌন্দর্যের মধ্যে আমাদের হৃদয়কে আবিষ্কার করবো।












সর্বশেষ সংবাদ
দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে দাঁড়াতেই পারল না আফগানিস্তান
জয় দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু মোহামেডানের
মালয়েশিয়ার বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হলো ৪৫ বাংলাদেশিকে
কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন
কুমিল্লা সরকারি কলেজে যথাযথ মর্যাদায় মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
আলুর দরপতন নিয়ে শঙ্কিত কুমিল্লার কৃষক
আজ লাকসামে আসছেন মির্জা ফখরুল
নগরীর শাকতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রবীণ বিএনপি নেতা আব্দুল হক আর নেই
কুমিল্লা মহানগর বিএনপির কাউন্সিল তিন পদেই একক প্রার্থী
রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলা হলো শহীদ মিনার
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২