সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সামাজিক অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। দেশে অস্বাভাবিকভাবে খুন, ছিনতাই, মব জাস্টিস, চাঁদাবাজিসহ নানা রকম অপরাধ কার্যক্রম মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে ওই এলাকার মানুষ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে চাঁদাবাজি ও দখল-বাণিজ্য। গত ১৫ বছরে যারা অবৈধভাবে দখলে ছিল তাদের প্রতিপক্ষ সেগুলো এখন দখল নিয়েছে। এতে বিভিন্ন স্থানে গোলাগুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখ্যযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্যমতে, গত দুই মাসে রাজধানীতে খুন হয়েছেন ৬৮ জন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে নানা কারণে হত্যার ঘটনা। নিরাপদ আবাসস্থলও হয়ে উঠেছে অনিরাপদ। স্বর্ণের দুলের জন্য যশোরের ঝিকরগাছায় আট বছরের শিশুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী ফুফুর বিরুদ্ধে। সিলেটে শিশু মুনতাহার নিখোঁজ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হয়। নিখোঁজের আট দিন পর শিশু মুনতাহার লাশ পাওয়া যায় পাশের ডোবায়। প্রতিবেশী গৃহশিক্ষিকার ক্ষোভ থেকেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। সম্প্রতি রাজধানীর আজিমপুরে বাসায় ঢুকে মায়ের কোল থেকে শিশু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যার শিকার হতে হচ্ছে। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, আর্থসামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধ লোভ পাওয়ায় এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দরুন এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশ এখনো স্বাভাবিক নিয়মে কাজ শুরু করতে পারেনি। এ সুযোগে কিছু বিশৃঙ্খল মানুষ সহিংস ও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারিরা আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছে। সম্প্রতি গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় সবুজ নামে এক ব্যবসায়ী যুবককে মোটরসাইকেলসহ পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পূর্বাচল উপশহরের একটি লেক থেকে শিল্পপতির সাত খণ্ড লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া নারী ও শিশু অপহরণ, ধর্ষণের পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধের জের ধরেও হত্যাকাণ্ড থেমে নেই। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় কন্যাশিশু বাড়ির ছাদে ওঠায় স্বামী শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে ছুরি মেরে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক অস্থিরতার পাশাপাশি নানা ধরনের অপরাধ সমাজে বিস্তার লাভ করায় উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষ।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ভোগবাদী মনোভাব, নৈতিকতার অবক্ষয়, সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, মাদক, বেকারত্ব প্রভৃতি কারণে সামাজিক অস্থিরতা সমাজকে রুগ্ন করে তুলছে। মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ, শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ার ফলে সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে। এর ফলে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিদিনই খবরে আসছে। সামাজিক অস্থিরতার কারণে দেশে আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যার ঘটনা ঘটছে। এ অস্থিরতার বিষবাষ্প গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়লে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে। অসহিষ্ণুতা আরও প্রকট হবে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে। আইনের শাসন ঠিক না থাকলে মানুষের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হবে। এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের অপরাধ বন্ধে সজাগ ও সতর্ক নজরদারি বাড়াতে হবে। সামাজিক অস্থিরতা কমিয়ে আনতে নাগরিকদের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষাক্রমগুলোতে নৈতিকতা শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় রোধে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।