
নীড়ে ফেরা স্মৃতির টানে, মিলি প্রীতির বন্ধনে’ এ স্লোগানে বর্ণিল আয়োজনে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার হরিশ্চর ইউনিয়ন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের ৪র্থ পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে স্কুলজীবনের মজার স্মৃতিতে ফিরে গেলেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ‘বন্ধু, কী খবর বল?’ দীর্ঘ বছর পর বাল্যকালের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হতেই এভাবে কুশল বিনিময় শুরু হয়। চলে আলাপচারিতা আর পারিবারিক ও কর্মস্থলের গল্প। কেউ কেউ ফিরে যান বিদ্যালয়জীবনের মজার স্মৃতির কথায়।
নতুন-পুরোনো শিক্ষার্থীদের এমন আড্ডায় জমজমাট হয়ে উঠেছিল কুমিল্লা জেলার শীর্ষ বিদ্যাপীঠের একটি লালমাই উপজেলার হরিশ্চর ইউনিয়ন হাই স্কুল এন্ড কলেজের সবুজ মাঠ। ঈদুল ফিতরের ১ দিন পর ২ এপ্রিল বুধবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের চতুর্থ পুনর্মিলনী। এতে প্রায় তিন হাজার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী অংশগ্রহন করেন।
বিদ্যালয় চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রথমে অভ্যর্থনা এরপর সকাল ৯.৩০টায় বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করা হয়। পরে আনন্দ র্যালি শেষ করে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়।
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আয়োজনের ফাঁকে ফাঁকে আড্ডায় মেতে ওঠেন শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় পর্বে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পরিচয় ও স্মৃতিচারণা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বছরের শিক্ষার্থীরা তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন যেসব শিক্ষক আলোকিত করেছেন হরিশ্চর হাই স্কুলকে, তাদের মধ্যে প্রয়াত সহকারী প্রধান শিক্ষক মুহম্মদ আলী আকবর, বাবু পরেশ চক্রবর্তী, বিজয় কৃষ্ণ মজুমদার, বাবু সতীশ চন্দ্র সাহা, আরব মৌলভী।
নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে ১৯৫৯ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুরেশ চন্দ্র সিংহ বলেন, ‘শেষ জীবনে এ রকম একটা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পেরে খুব ভালো লাগছে।আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে ১৯৯২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ও যমুনা গ্রুপের সিনিয়র জিএম মো: গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘আজকের দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০২১ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী পূর্ণতা সাহা বলেন স্মরণকালের সবচে সুন্দর অনুষ্ঠান, এধরণের আয়োজন যেন পুনরায় করা হয়।
পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও পিনাকী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং এসএসসি ১৯৮৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও দেশবরেণ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মজুমদার জুয়েল, ডা. আশিকুর রহমান, ডা: শামীম ইকবাল মজুমদার ও মুহাম্মদ নজরুল ইসলামের যৌথ সঞ্চালনায় উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সমন্বয়ক ডা. সালেহ আহমেদ।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন হরিশ্চর ইউনিয়ন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ও পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ ইলিয়াস কাঞ্চন এবং প্রধান সমন্বয় প্রকৌশলী আবদুল বারী।
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী।
শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন পুনর্মিলনী উদযাপন পরিষদের প্রকাশনা পরিষদের উপদেষ্টা প্রফেসর আবুল খায়ের, এইচ এমএস গ্রুপের চেয়ারম্যান হাজী শাহজাহান,অভ্যর্থনা উপকমিটির আহ্বায়ক মাহবুবুর আলম খোকন, বাংলাদেশ বেতার প্রধান প্রকৌশলী ও পুনর্মিলনী উদযাপন কমিটির প্রকাশনা উপকমিটির আহবায়ক মুনীর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন, এনাম মেডিকেল কলেজ প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. মোতাহার হোসেন জুয়েল,রেক্স ফ্যাশন লি. ও কে আলী নিটওয়ার লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কোরবান আলী।
এতে উপস্থিত ছিলেন- উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান,, দে এন্ড কোং চট্টগ্রাম এর হারাধন দে এফসিএ,অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) জাফর ইকবাল, যুগ্মসচিব (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, ডা: ধনঞ্জয় মজুমদার, প্রাক্তন শিক্ষক মো: ছিদ্দিকুর রহমান, আবুল কালাম,মো: আবদুস সোবহান, রতন কুমার আচার্য্য, পেরুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমান উল্যাহ, এসএসসি ৯২ ব্যাচের মুহাম্মদ মিজানুর রহমান, লালমাই প্রেস ক্লাবের সভাপতি ড. শাহজাহান মজুমদার, উদযাপন কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুজ্জামান শাহীন, হাফেজ আহমেদ সোহেল,মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা: আহসান উল্যাহ প্রমুখ।
জানা যায়, ডাকাতিয়া নদীর কোল ঘেঁষে ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে পথচলা শুরু করে ২০২৫ সালেও সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৭৬ বছরের এই বিদ্যাপীঠ। আপন আলোয় আলোকিত আজ উপজেলায়, জেলায় ও বিশ্ব মাঝে। ১৯৫২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাশের মধ্য দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানের সাফল্য ও অর্জনের পথচলার শুভ সূচনা হয়।
১৯৬৬ সালে কুমিল্লা বোর্ডে বাণিজ্য বিভাগে মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান দখল করার পর থেকে এ বিদ্যালয়ের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। হরিশ্চর ইউনিয়ন হাইস্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন স্বর্গীয় বাবু মহিম চন্দ্র সাহা। পরবর্তীতে মকবুল আহমেদ বিএসসি, বিটি ১৯৫০ সালে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য হরিশ্চর ইউনিয়ন হাইস্কুলে যে মশাল প্রজ্বলিত করেছেন তা আজও স্ব-মহিমায় দীপ্তিমান।
প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক মরহুম মকবুল স্যারের লেখা বই থেকে জানা যায়, খলিলপুর গ্রামের বাবু ভগবান চন্দ্র সাহা ও বাবু ঈশ্বর চন্দ্র সাহা ৩০ শতাংশ জমি দান করায় এই জমির উপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে একটি মাইনর স্কুল স্থাপিত হয় এবং নামকরণ করা হয় হরিশ্চর মধ্য ইংরেজি স্কুল। অতঃপর ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি মাসে এটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ভূমির পরিমাণ ৩.৫১ একর। হরিশ্চর নামটি প্রসিদ্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ হরিশ্চর ইউনিয়ন হাইস্কুল। যুগ যুগ ধরে সাফল্যের দ্যুতি ছড়িয়েছে সুদূর মার্কিন মুল্লুকের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা) ও হালের ইনটেল কর্পোরেশন পর্যন্ত।