ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে দেখছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
শুক্রবার বিকালে এ বৈঠকের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এই বৈঠকটা নিশ্চয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটার (বৈঠক) প্রয়োজন আছে এবং প্রয়োজন ছিল।”
মির্জা আব্বাস বলেন, “এই বৈঠকের জন্যে আমাদের সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চেষ্টা করছিল। এই সময়ে একটা বৈঠক হওয়ার দরকার ছিল।
“তবে আমি জানি না বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে। বিশদ না জানলে আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।”
গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এর পর দুই দফা মোদীর সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও তা হয়ে ওঠেনি। ফলে বিমসটেক সম্মেলনে তাদের বৈঠক হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল।
প্রতিবেশী দুদেশের সম্পর্কের ‘স্থবিরতার’ মধ্যে ব্যাংককে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের প্রস্তাব দিয়ে দিল্লিতে চিঠি পাঠিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই চিঠির জবাব না পাওয়ার মধ্যে মোদীর প্রকাশিত সফরসূচিতে ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কোনো বিষয় ছিল না।
তবে শুক্রবার দুই দেশের সরকার প্রধানের বৈঠকটি হয়েছে।
সে বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বণ্টনসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বৈঠকের পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন।
এ বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চাইলে মির্জা আব্বাস বলেন, “আমি না জেনে কিছু বলতে পারব না। যে সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে আপনার মুখ থেকে শুনলাম, নেহাতই গুরুত্বপূর্ণ এগুলো।
“শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং এই বিচার সময়ের দাবি, জনগণের দাবি, আমাদের দাবি। যদি শুধুমাত্র শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ বিষয়ে কথাবার্তা হয়ে থাকে, তাহলে আমি একটু যোগ করতে চাইব, উনার (শেখ হাসিনা) যেসব সাঙ্গ-পাঙ্গ আছে, সেখানে যারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে তাদেরও যেন সঙ্গে ফেরত পাঠানো হয়।”
ঢাকার শাহজাহানপুরে নিজের বাসার চেম্বারে রাজনীতি, সংস্কার, জাতীয় নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা আব্বাস।
‘শেখ হাসিনা বিচার হওয়া জরুরি’
বিএনপির এই নেতা বলেন, “ভারতের উচিত শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তার বিচারটা হয়। কারণ একটা ফ্যাসিস্টের বিচার হওয়া খুব জরুরি। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্য না, সারা বিশ্বের জন্য খুব জরুরি। কোনো ফ্যাসিস্ট কখনো বিনা বিচারে যেতে পারে না।”
ইউনূস-মোদী বৈঠকে বিষয়ে তিনি বলেন, “তিস্তার পানির আমাদের দিতে হবে এবং তিস্তা বাঁধের প্রয়োজনীয় সংস্কার, বাঁধ আমাদের করতে হবে। তিস্তা ও ফারাক্কার বিষয়ে নিয়ে বাংলাদেশ কোনো ছাড় দেবে না।”
‘পরিবর্তনের পর এখন জনগণ শক্ত অবস্থানে’
মির্জা আব্বাস বলেন, “এখন বাংলাদেশের মানুষ একটা শক্ত অবস্থানে আছে। ভারতের সঙ্গে যেসব অসম চুক্তি বিগত সরকারের আমলে হয়েছে এখন সেসব চুক্তি বাতিল করা দরকার। যেসব অসম চুক্তি কার্যকর হয় নাই, সেগুলো বাতিল করতে হবে।”
ইউনূস-মোদীর আলোচনায় সীমান্ত হত্যার বিষয়টি থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এগুলো যদি হয়ে থাকে আমি মনে করি, নিশ্চয়ই ভালো আলোচনা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে প্রফেসর ইউনুস সাহেব আরও কিছু আলোচনা করবেন, ভালো ফলাফল আমাদের দেবেন।”
‘নির্বাচন ও সংস্কার প্রসঙ্গে’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, “নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি। এক গ্রুপ আছে দেশে, আরেক গ্রুপ আছে বিদেশে যারা নাকি নির্বাচনকে বাদ দিয়ে সংস্কারের কথা বলছেন। আবার বলার চেষ্টা করছেন, সংস্কারের কথা শুনলে নাকি বিএনপির মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।”
“আমার এখানে তীব্র আপত্তি। বিএনপি কখনো সংস্কারের বিপক্ষে নয়, বিএনপি বরাবর সংস্কারের পক্ষে, একই সঙ্গে বিএনপি নির্বাচনেরও পক্ষে। দুইটারই প্রয়োজন আছে। কিন্তু এমন সংস্কারের পক্ষে বিএনপি নয় যেটি দেশের জনগণের স্বার্থে, জনগণের অধিকারের বাইরে চলে যাবে।”
তিনি বলেন, “যাদের কাছে সংস্কার কমিশনের স্প্রেডশিট গেছে, যারা পড়েছেন তারা দেখবেন, এমন কিছু প্রস্তাব আছে যেগুলো বাংলাদেশের মানু্যের সঙ্গে মানানসই নয়, সেগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে যায় না। যেগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে যায় না সেগুলো আমরা কেনো মানব?”
সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে যেসব ব্যক্তি বাজে কথা বলছেন, গালি দিচ্ছেন তাদের সমালোচনা করেন মির্জা আব্বাস।
‘বিএনপি আর আওয়ামী লীগ এক নয়’
মির্জা আব্বাস বলেন, “এখন তারা কি করতেছে? বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ব্র্যাকেট করার চেষ্টা করতেছে।”
“বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ব্র্যাকেট করার সুযোগ নাই। বিএনপির জন্মই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, এটা বুঝতে হবে। আপনারা দেখবেন, এই গোষ্ঠিগুলো ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে সমর্থনকারী ব্যবসায়ীমহল, তৎকালীন আমলা, বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের বিরুদ্ধে কিছু বলছে না।
“আমি ব্যবসায়ীদের নাম বলতে পারি, সেই নাম এখন বলতে চাই না। ওরা এখন সকলে মিলে বিএনপির বিরুদ্ধে লেগেছে, উদ্দেশ্য একটাই, এ দেশে ফ্যাসিজম ও আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা।”
হত্যা মামলায় জড়িত আওয়ামী লীগের নেতারা কীভাবে জামিন পাচ্ছেন তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মির্জা আব্বাস।