রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়নের নিচে
Published : Friday, 21 October, 2022 at 12:00 AM
বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা ২৮ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম। গতকাল বুধবার দিনের শুরুতে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এই সূচকের পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার।
২০২০ সালের ৩০ জুনের পর যা সর্বনিন্ম। আগের দিন মঙ্গলবার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার। আগস্ট মাসে আমদানি খাতে ব্যয় হয়েছে ৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে বর্তমানের রিজার্ভ দিয়ে পাঁচ মাসের কিছু বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় প্রতিনিয়ত রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূলত এর ফলেই রিজার্ভ কমছে। এছাড়া রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও তেমন গতি নেই। আবার আমদানি ব্যয়ও কমানো সম্ভব হয় নি। অবশ্য আমদানি ব্যয় কমানো ও রেমিট্যান্স বাড়াতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান আছে। তবে নানা কারণে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয় নি। পরিস্থিতি সামলাতে সরকার এখন আইএমএফের ঋণ নিতে চাইছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে আমদানি ব্যয় প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ২৬৯ কোটি (১২.৬৯ বিলিয়ন) ডলার হয়েছে। আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে রপ্তানি আয় ১৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে এক হাজার ২৫০ কোটি ডলার এসেছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় মাত্র ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৫৬৭ কোটি ডলার। প্রথম দুই মাসে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বেড়েছিল। তবে সেপ্টেম্বরে কমেছে।
চলতি অক্টোবর মাসেও রেমিট্যান্সপ্রবাহে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই মাসের ১৩ দিনে (১ থেকে ১৩ অক্টোবর) এসেছে ৭৭ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় অংকের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সামগ্রিক ভারসাম্যেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
আইএমএফের ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন (বিপিএম৬) ম্যানুয়াল অনুযায়ী, কেবল ব্যবহারযোগ্য অংশকেই রিজার্ভ হিসেবে দেখাতে হয়। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আইএমএফের পদ্ধতি অনুসরণ করে হিসাব করলেও বাংলাদেশ বিভিন্ন তহবিলে যোগান দেওয়া অর্থকেও রিজার্ভ হিসাবে দেখাচ্ছে। এ হিসাব পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) ৭ বিলিয়ন ডলার, শ্রীলঙ্কাকেও দেয়া ২০ কোটি ডলার ঋণ এবং সরকারের আরও কয়েকটি প্রকল্পে দেয়া ঋণকেও রিজার্ভে অন্তভূক্ত করে মোট রিজার্ভের হিসাব করে। সব মিলিয়ে এই অঙ্ক ৮ বিলিয়ন ডলারের মতো।
কিন্তু আইএমএফ এই ৮ বিলিয়ন ডলার বাদ দিয়ে রিজার্ভের হিসাব করতে বার বার তাগাদা দিয়ে আসছে। আইএমএফের এই মানদণ্ড বিবেচনায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ২৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
অর্থনীতির গবেষক গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরও মনে করেন বাংলাদেশের প্রকৃত রিজার্ভ আসলে এখন ২৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
কারণ ব্যাংকা করে তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে রিজার্ভের হিসাব দিচ্ছে, তাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আসলেই মানা হচ্ছে না। কেননা, বাংলাদেশের যদি কোনো বিশেষ প্রয়োজনে এখনই পণ্য আমদানি করতে হয়, তখন কিন্তু এই ৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করা যাবে না। তাই আপৎকালীন প্রয়োজনের জন্য যে বিদেশি মুদ্রা তাৎক্ষনিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, সেটাকেই প্রকৃত রিজার্ভ হিসাবে হিসাব করতে হবে।’
‘রিজার্ভ পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে’ মন্তব্য করে আহসান মনসুর বলেন, ‘নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আকুর বিল পরিশোধ করতে হবে। গত ৮ সেপ্টেম্বর আকুর জুলাই-আগস্ট মেয়াদের ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আমদানির বিল পরিশোধ করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারও যদি পরিশোধ করতে হয়, তাহলেও কিন্তু প্রকৃত রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসবে। তখন কিন্তু দেশের অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়বে।’
‘তাই, রিজার্ভ যাতে আর না কমে সেজন্য আইএমএফের ঋণটা যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’
বাংলাদেশে রিজার্ভের উল্লম্ফন হয় আসলে ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রভাব শুরুর পর। তখন আমদানি ব্যয় কমলেও ২০২০-২১ অর্থবছরে রেকর্ড ২৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স আসে। আবার রপ্তানিতেও ১৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ছিল। যে কারণে ২০২০ সালের শুরুর দিকে ৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে থাকা রিজার্ভ বাড়তে-বাড়তে গতবছরের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।
এক বছর আগে গত বছরের ১৯ অক্টোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার বেশি; ৪৬ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ কমেছে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।