
ছেলে ইমরানের খোঁজ মিলছে না বছর দুয়েক ধরে, বছর খানেক আগে পুত্রবধূও চলে গেছে বাপের বাড়ি। তাদের রেখে যাওয়া দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে বেজায় বিপদে পড়েছেন দাদি হনুফা বেগম। তিনি এখন বড় ছেলের ঘরের নাতির আয় আর প্রতিবেশীদের সহায়তায় নাতনিদের নিয়ে কোনোরকমে দিনাতিপাত করছেন।
উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছেলে ইমরানের ঘর ছাড়ার খবরে হনুফা বললেন, “বাইচ্চাগুলাক নিয়া আমি খুব পেরেশানিতে আছি। আমি কাজকর্ম করতে পারি না।”
সোমবার ঘর ছাড়া যে ৩৮ জনের তালিকা র্যাব প্রকাশ করেছে, তার মধ্যে কুমিল্লার লাকসামের ইমরানের নামও রয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে মধ্য বয়স্ক ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনই আছেন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণও। এদের কারও কারও আগে গ্রেপ্তার হওয়ার ইতিহাস আছে।
কিন্তু হনুফার মতো অনেকের সংসারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় ভেঙে গেছে পরিবারই, পথে বসার উপক্রম হয়েছে কারও কারও। তবে সামাজিকভাবে বিপাকে পড়েছে সবগুলো পরিবারই।
‘জঙ্গিবাদে’ জড়িয়ে গত দুই বছরে বাড়ি ছাড়া ৫৫ তরুণের খোঁজ পেয়েছে র্যাব, তাদের মধ্যে ৩৮ জনের তালিকা সোমবার প্রকাশ করে এ বাহিনী।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সেদিন বলছিলেন, দুই বছর থেকে দেড় মাসের মধ্যে এই তরুণেরা নিরুদ্দেশ হয়। পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ে তাদের জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সঙ্গে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর সোমবার সংবাদ সম্মেলনে করে এ তথ্য তুলে ধরেন র্যাব মুখপাত্র। এর আগে গত বুধবার ওই সংগঠনের সাতজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব, যাদের মধ্যে চার তরুণ সম্প্রতি ঘরছাড়া হয়েছিল বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
র্যাবের তালিকার সূত্র ধরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় নিখোঁজ ইমরানের মা হনুফার সঙ্গে। তিনি জানালেন, ইমরান দেশে কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতেন। বছর ১৫ আগে পরিবার থেকে তাকে কাতারে পাঠানো হয়। ইমরান সেখানে প্রায় আট বছর ছিলেন। রোড রোলারের কাজ শিখেছিলেন। টাকাও পাঠাতেন। পরিবারটি ভালোই চলছিল।
বছর সাতেক আগে দেশে ফেরেন ইমরান। দেশেও কিছুদিন রোড রোলারের কাজ করেছিলেন। দেশে ফিরে বিয়ে করেন। তার পাঁচ বছর ও আড়াই বছর বয়সী দুটি মেয়ে আছে।
ছেলের অন্তর্ধান নিয়ে হনুফা বলছিলেন, এমনিতে পারিবারিকভাবেই তারা ধর্ম-কর্ম করেন। তবে এভাবে যে ইমরান নিখোঁজ হবেন, তা কেউ ভাবতে পারেনি।
কোভিড মহামারী শুরুর আগে আগে একদিন সকাল বেলায় বেরিয়েছিলেন ইমরান, আর বাসায় ফেরেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে তারা পুলিশের কাছে যাননি। পরে পুলিশ-র্যাব বাসায় গিয়ে জানিয়েছে, তার ছেলে জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হয়েছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
ইমরানের হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ায় মা হনুফাকে পড়তে হয়েছে চরম দুর্বিপাকে। আগেই স্বামী হারিয়েছেন হনুফা। নিজে কোনো উপার্জন করতে পারেন না।
হনুফা জানালেন, ইমরান নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বছর খানেক পরে তার স্ত্রীও মেয়ে দুটিকে রেখে বাসা থেকে চলে যায়। তিনি আবার বিয়ে করেছে বলে তারা শুনেছেন। এখন দুই নাতনি নিয়ে সংসার যেন আর চলে না। বড় ছেলের ঘরের এক নাতি গ্রামের এক গরুর খামারে কাজ করে কিছু উপার্জন করে। সেই টাকা আর প্রতিবেশীদের কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে চলছে পরিবারটি।
পরিবারের করুণদশার দশার কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে গলা ধরে আসে হনুফার। বললেন, “আমার পোলার কিছু খবর পাইছেননি? যদি পান তাইলেৃ আমি অনেক দোয়া করি ও যেন ফিরি আসে।”
কিশোর ছেলের অপেক্ষায় মা:
সিলেটের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাহিয়াত চৌধুরী গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ। মা শাহানা চৌধুরী জানালেন, কোভিড মহামারীর সময় থেকে তার ছেলে হঠাৎ করে ধর্মকর্মে বেশি মনোযোগী হয়। বাড়ির সবাইকে ধর্মের নানা বিষয়ে বলতেন।
“গত বছরের মাঝামাঝি চিল্লায় যাচ্ছে বলে বাড়ি থেকে বের হয়। ফেরার কয়েকদিন পরে আবারও তিনদিনের চিল্লায় যেতে চায়। যাওয়ার সময় নিজের ফোনটাও সঙ্গে নেয়। তিনদিন পর্যন্ত তার সঙ্গে যোগাযোগও ছিল। এরপর ফোন বন্ধ, তার আর কোনো খোঁজ নেই।”
এর কয়েকদিন পর ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট থেকে একজন কর্মকর্তা ফোন করেন। ফোন পেয়ে তারা ঢাকার মিন্টো রোডে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কার্যালয়ে আসেন। সেখানে কর্মকর্তারা তাহিয়াতকে তাদের সামনে হাজির করেন।
শাহানা চৌধুরী বলেন, “অফিসাররা ছেলেরে যত না বকছে, আমাদের আরও বেশি বকছে। কেমন বাবা-মা আমরা, ছেলেকে দেখে রাখতে পারি না। ওর পরিবর্তনটাও বুঝতে পারিনি। যাই হোক, আমরা ওকে বাড়িতে নিয়ে আসলাম।
“ওর টেস্ট পরীক্ষা শুরু হইল। পরীক্ষার শেষ দিন পাঁচ মিনিটের জন্য বাড়ির বাইরে যেতে চায় একটা জিনিস কেনার জন্য। ওই যে গেল আর ফিরল না।”
কাঁদতে কাঁদতে শাহানা চৌধুরী বলেন, “আমার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ও সবচেয়ে মেধাবী। ক্লাস এইটে বৃত্তি পাইছে, এসএসসির রেজাল্টের জন্যও স্কলারশিপ পাইলো। ছেলেটা আমার কোথায় গেল। আমরা কিচ্ছু বুঝিনি।”
একজনের জন্য ভুগছে পুরো পরিবার:
দেড় বছর আগে সিলেট থেকে নিখোঁজ হন মাদ্রাসা শিক্ষক শিব্বির আহমেদ। সিলেটের একটি মাদ্রাসা থেকে টাইটেল পাস করে সেখানকারই আরেকটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। নিখোঁজ হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে তার বাবাকে বলেছিলেন, তিনি চাকরির জন্য দেশের বাইরে যেতে চান। মালয়েশিয়া অথবা দুবাইতে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলছিলেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে তার বাবা আব্দুস সালাম জানালেন, গত বছর রমজানের আগে শিব্বির নিখোঁজ হয়, দেড় বছর হতে চললেও ছেলের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। নানাভাবে খোঁজখবর করার চেষ্টা করেছেন, তবে পাননি।
থানায় কোনো অভিযোগ করেছেন কি না- জানতে চাইলে সালাম বললেন, “(নিখোঁজের) এক সপ্তাহ আগে সে বলছিল ‘আব্বা বিদেশ যাব’। টুকটাক কথা হইছে। আমি বলছি, টেকা নাই, পয়সা নাই, বিদেশ ক্যামনে যাবি। আমি ভাবছি- সে চাকরি করছে, তার কাছে কিছু টেকা-পয়সা থাকতেও পারে। পরে হঠাৎ একদিন নাই হয়ে যায়। আমি ভাবছি সে হয়ত না জানায়া বিদেশ গ্যাছেগা।
“পরে এমনিই সবাই জেনে গেছে। থানার মাধ্যমে খবর বাইরাইছে। তার সঙ্গে নাই হওয়া একটা ছেলে মনে হয় পুলিশের কাছে ধরা পড়ছিল। তার মাধ্যমে খবর পাইয়া পুলিশ বাড়িত খোঁজ নিছিল। তখন আমরা জানলাম।”
ছেলের এভাবে নিরুদ্দেশ হওয়ার কথা জানাজানি হওয়ার পর সামাজিকভাবে প্রায় একঘরে হওয়ার অবস্থা পরিবারটির।
আব্দুস সালাম বলছিলেন, “লোকে মন্দ বলে, মিশতে চায় না। পুলিশ-র্যাব আসা-যাওয়া করে। সেগুলা আমাদের সামলাইতে হয়। অন্য সন্তানদের কর্মস্থলে সমস্যা হয়। কেউ কথা বলতে চায় না।”
পরিবার জানে বিদেশে:
ফরিদপুরের চরভদ্রাসনের মুহাম্মদ আবু জাফরের সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ নেই অনেকদিন। দেড় দশক আগে জাফর সৌদি আরব গিয়েছিলেন। তখন থেকেই তিনি অনেকটা বিচ্ছিন্ন।
তার ভাই মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিদেশে যাওয়ার আগে এসএসসি পরীক্ষার পর জাফর তাবলিগে যুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে একদল লোকের সাথে হাতাহাতির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
“মামলা নিষ্পত্তির পর তাকে সৌদি আরব পাঠানো হয়। এরপর থেকেই বলতে গেলে আর যোগাযোগ নেই। আমরা ওর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি, কিন্তু পারি নাই।’
তার বিষয়ে কখনও থানায় যোগাযোগ করেননি জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, “ও বিদেশে আছে বলেই তো আমরা জানি। পরে পুলিশ আইসা বলছে, সে জঙ্গি হইছে।”
আসাদুজ্জামানও ভাইয়ের খবর জানতে চান। তিনি বলেন, “আমরা ছয় ভাই। ও ছোট। কতো জায়গায় খবর নিছি, যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কোনো খোঁজ পাইনি। আপনাদের কাছে কোনো খবর আছে নাকি? ওর জন্য এখন আমাদের কতো কথা শুনতে হয়।”
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলছেন, “বিভিন্ন সময় আমরা যে তথ্য পাচ্ছিৃ আমাদের মনে হয়েছে এতোগুলো লোক ধাপে ধাপে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। অনেক পরিবার আছে, যাদের সন্তান দুই বছর ধরে নিরুদ্দেশ; কিন্তু আমাদের কখনও জানায়নি।
“আমরা যখন তাদের কাছে যাচ্ছি, এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলছি তখন অনেকে বলছে হয়তো তারা বিদেশে। আবার যারা দুই-তিনমাস নিখোঁজ, তাদের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে হয়তোবা চিল্লায় গিয়েছে। একজন বাবা-মা যখন বলে যে তাদের সন্তান বিদেশে আছে, তখনতো আমাদের বিশ্বাস করতে হয়। কিন্তু পরে খোঁজ নিয়ে ভিন্ন বিষয় জানা যায়।”
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা যখন এইসব তথ্য যাচাই করার জন্য তাদের পরিবারের কাছে গিয়েছে, তখন অনেক পরিবার বলেছে- তাদের সন্তান বিদেশে রয়েছে বলে তারা জানেন। তারা এও বলেন যে, যখন তাদের টাকার প্রয়াজন হয়েছে, তখন তারা সন্তানের কাছ থেকে মাঝে মাঝে তা পেয়েছেন, যদিও সেটা খুব বেশি অর্থ নয়।
“ৃ তবে আমাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা বলেছে, ওই ব্যক্তিরা বিদেশে নয়, সংগঠনের কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে। মাঝে মাঝে সংগঠনের তহবিল থেকে পরিবারগুলোকে টাকা দেওয়া হয়েছে।”