
ড. প্রণব কুমার পান্ডে ।।
২০২০
সালের শুরু থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর সব দেশে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছে
করোনা অতিমারি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য খাত ভেঙে
পড়েছিল সেই সময়। প্রত্যেকটা দেশের সরকার অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব
প্রদান করেছিল মানুষের জীবন রক্ষার দিকে। করোনা অতিমারির প্রাথমিক পর্যায়ে
যেভাবে মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে, তাতে পৃথিবীর সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের মূল
দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল কীভাবে জনগণের জীবন রক্ষা করা যায়। তবে জনগণের জীবন
রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় করোনার টিকা বা ওষুধের সঙ্গে মানুষের জীবিকার
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ, কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল লকডাউন বাস্তবায়ন করা। আর এই লকডাউনের সময়
মানুষকে ঘরের মধ্যে অন্তরীণ থাকতে হয়েছে। সে সময় জীবিকা নির্বাহের জন্য
প্রত্যেক দিনের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য জীবন অতিবাহিত করা
অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ, মাসের পর মাস লকডাউন বাস্তবায়নের ফলে
জীবিকার বিষয়টি তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে,
সরকারের পক্ষ থেকে যতদূর সম্ভব এই দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে,
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টার ফলে করোনার টিকা আবিষ্কৃত হয়।
সেই সময় ভ্যাকসিন কূটনীতিতে শেখ হাসিনা অনবদ্য হয়ে উঠেছিলেন। তিনি খুব
দ্রুত দেশের বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও
প্রদান করার মাধ্যমে জনগণের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন
করেছেন। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশের তুলনায় ভ্যাকসিন প্রদানের ক্ষেত্রে
বাংলাদেশের সফলতা অনেক বেশি ছিল। সার্বিকভাবে করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পৃথিবীর অনেক দেশের কাছে রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি
পেয়েছেন। বিভিন্ন দেশ যখন করোনার প্রভাব মোকাবিলা করে পুনরায় অর্থনৈতিক
উন্নয়নের চেষ্টা শুরু করেছে, ঠিক সেই সময় রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ পৃথিবীকে
পুনরায় অস্থির করে তুলেছে।
প্রথম দিকে মনে করা হয়েছিল যুদ্ধ খুব বেশি
দিন স্থায়ী হবে না, কিন্তু পরবর্তীতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী আকার ধারণ করলে
পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা দেখা যায়।
এই মন্দার ফলে বিভিন্ন দেশের
অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ
প্রত্যক্ষ করেছি। এছাড়া, যুক্তরাজ্যসহ অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশে
মুদ্রাস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিটি পণ্যের
দাম বেড়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও
ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে এর মূল্য বৃদ্ধি
করতে বাধ্য হচ্ছে প্রায় সব দেশের সরকার। ইউরোপের দেশসমূহ জ্বালানি তেলের
মূল্য বৃদ্ধির কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না বিধায়
সরকার বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে জনগণকে সাশ্রয়ী হবার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশ
যেহেতু অন্য গ্রহের কোনও দেশ নয়, স্বাভাবিকভাবেই এই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক
মন্দার প্রভাব বাংলাদেশের ওপরে পড়েছে বা আরও পড়বে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে এই
প্রভাবকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কীভাবে মোকাবিলা করেছে? অথবা আগামীতে
কীভাবে মোকাবিলা করবে?
আমরা যদি ২০২২ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার
দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে তাহলে দেখা যাবে যে বাংলাদেশ সরকার এই বৈশ্বিক মন্দা
এখন পর্যন্ত বেশ সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করছে। যদিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের
পক্ষ থেকে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে।
কিন্তু বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক
মন্দায় যেসব দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়াতে পারে সেসব দেশের তালিকায় বাংলাদেশের
নাম না থাকা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পর্যন্ত বেশ শক্ত
অবস্থানে রয়েছে। যদিও কিছু দিন আগে বাংলাদেশের রিজার্ভ কিছুটা কমে যাওয়ায়
এক ধরনের সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল বিভিন্ন স্তর থেকে। এর মূল কারণ ছিল
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আমদানি ব্যয় নির্বাহ করার ক্ষেত্রে বেশি
ডলার খরচ করা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থের
অবমূল্যায়ন কিংবা বিলাস পণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করার কারণে গত দুই-তিন
মাসে এই অবস্থার বেশ ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। ফলে, আমরা এখন পর্যন্ত খুব বড়
বিপদের আশঙ্কা করছি না। সার্বিকভাবে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে
পর্যবেক্ষণ করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
যুদ্ধ চলাকালীন ইউরোপের বিভিন্ন
দেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের স্থগিতাদেশ
প্রদানের ফলে রাশিয়া অন্যান্য দেশে তেল, গ্যাস এবং অন্যান্য পণ্য রফতানি
বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে, পৃথিবীব্যাপী তেল ও গ্যাসসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের
মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে অন্যান্য দেশকে বিপদের
মুখে ঠেলে দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিভিন্ন ফোরামে উল্লেখ করেছেন যে
নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হবে না। এই সমস্যার সমাধান করতে
হলে আলোচনার মাধ্যমে করা উচিত। এই যুদ্ধকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে
সঠিক অবস্থানে থেকে কারও পক্ষ অবলম্বন না করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার
ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুদ্ধ শুরু
হওয়ার পর থেকে অনেকেই ধারণা করেছিল যে বাংলাদেশ হয়তো রাশিয়ার বিপক্ষে
অবস্থান নেবে। বাংলাদেশ তেমনটা করলে তার প্রভাব অবশ্যই বাংলাদেশের ওপরে
পড়তো। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোনও পক্ষ অবলম্বন না করে যে প্রক্রিয়ার
মাধ্যমে যুদ্ধের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় সেদিকে সঠিকভাবে এগিয়ে
চলেছেন।
এই যুদ্ধকালীন এশীয় অঞ্চলের ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে মাননীয়
প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। একদিকে যেমন
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে আবার চীনের সাথে বাংলাদেশের
বাণিজ্যিক সম্পর্কে বিষয় জড়িত রয়েছে। আবার একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার
সম্পর্কের বিষয় রয়েছে। সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে পথে
হাঁটছেন সেটি বাংলাদেশকে এখন পর্যন্ত অনেকটা নিরাপদে রেখেছে বলেই আমি
বিশ্বাস করি।
আমরা জানি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো
কারও সাথে শত্রুতা নয়, সকলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ এই রীতি মেনেই বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক
রক্ষা করে চলেছে।
কিন্তু কখনও কখনও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সাথে সাথে
বাণিজ্যিক সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন হয় এবং সেই
কারণেই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের বিনিয়োগ বেড়েছে যা মাননীয়
প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বের প্রতিফলন। অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন যে
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কিংবা চীনের সাথে
বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি
প্রতিটি রাষ্ট্র আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং সেদিক থেকে বিচার করলে
বাংলাদেশ সঠিকভাবেই প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে।
চীনের সাথে যেমন আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, ঠিক তেমনি ভারত হচ্ছে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র, প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ফলে এই
রাষ্ট্রের সাথে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রয়েছে।
গত এক দশকে
ভারতের সাথে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক ছিল তা এখনও সে অবস্থায় রয়েছে বলেই আমি
বিশ্বাস করি। তবে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এই ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে
বাংলাদেশের জনগণকে একদিকে যেমন বিভ্রান্ত করতে চায়, তেমনি ভারত বিরোধিতার
কার্ডটি উসকে দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমন দুই
বছরের অধিক সময় ধরে চলমান কোভিড-১৯ অতিমারি সফলভাবে মোকাবিলা করে মানুষের
জীবন রক্ষা করেছেন এবং অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থায় ধরে রেখেছেন, ঠিক তেমনি
বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বাস করে যে বর্তমানে রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে
সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাও শেখ হাসিনা সরকার সঠিকভাবে কাটিয়ে উঠতে
সক্ষম হবে।
গত প্রায় ১৪ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে
বিশ্বনেতায় পরিণত হয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বের পরিপক্বতা এবং কূটনৈতিক দক্ষতা
বাংলাদেশকে পৃথিবীর সকল দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অর্থনৈতিক মন্দার
প্রভাব মোকাবিলা করতে সহায়তা করবে। আমাদের বিশ্বাস বাংলাদেশের জনগণ গত
প্রায় ১৪ বছরে দেশে যে উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করেছে, তার ধারাবাহিকতা রক্ষা পাবে
এবং খুব দ্রুতই মন্দা কাটিয়ে উঠে অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
মূল্য কমবে এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসবে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ
মানুষের প্রত্যাশা, আগামী নির্বাচনে জনগণ শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখে
বাংলাদেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবেন।
লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।