ই-পেপার ভিডিও ছবি বিজ্ঞাপন কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যোগাযোগ কুমিল্লার কাগজ পরিবার
শ্রমিকদের বেতন বোনাস ও সুরক্ষা নিশ্চিত করুন
Published : Saturday, 1 May, 2021 at 12:00 AM
শ্রমিকদের বেতন বোনাস ও সুরক্ষা নিশ্চিত করুনডা.ওয়াজেদুল ইসলাম খান ||
মে দিবস বিশ্বের কোটি কোটি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের কাছে উৎসব ও অনুপ্রেরণার দিবস। ঐতিহাসিক এই দিবসটি পৃথিবীব্যাপী উৎসাহ ও আনন্দের মাধ্যমে দাবি আদায়ের দিবস হিসেবে শ্রমিকরা পালন করে থাকে। কারণ আজ থেকে ১৩৪ বছর আগের এই দিনে শ্রমিকরা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিল শোভন কাজ, ন্যায্য মজুরি এবং আট ঘণ্টা শ্রম, আট ঘণ্টা বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা বিনোদন করার অধিকার।
মে দিবস হচ্ছে গোটা পৃথিবীর শ্রমজীবী সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচনা করার দিন। শ্রেণিবৈষম্যের বেড়াজালে যখন তাদের বন্দি জীবন ছিল তখন মে দিবস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খুলে যায় শ্রমিকদের শৃঙ্খল। এর ফলে আস্তে আস্তে লোভ পেতে থাকে সমাজের শ্রেণিবৈষম্য। আমাদের দেশের শ্রমিকরা উৎসাহ ও উদ্দীপনায় পালন করে মে দিবস। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দেশের শ্রমিকরা মে দিবসে ছুটি ভোগ করে আসছে। এই দিবসে শ্রমিকরা রাজপথে মিছিল সমাবেশ করে তাদের অর্জিত অধিকার আরো সংহত করার আওয়াজ তোলে। একই সঙ্গে শ্রমিকরা দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সংগতি রেখে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, ব্যক্তিমালিকানা-নির্বিশেষে সব শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠানে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রদান, শ্রমিকবান্ধব ও গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন, সমকাজে সমমজুরি প্রদান, কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মজুরিবৈষম্য রোধ, বন্ধ কলকারখানা চালু, ব্যাপক কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী নিশ্চিত, ছুটি ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার প্রদানের দাবি এবং মালিক কর্তৃপক্ষের ছাঁটাই, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে থাকে।
এবারের মে দিবসেও ছুটি চলছে। তবে তা কোনো স্বাভাবিক ছুটি নয়। কয়েক মাস ধরে মরণব্যাধি করোনাভাইরাসে সারা পৃথিবী স্তব্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত এই মহামারি বাংলাদেশেও বিস্তার লাভ করেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সাধারণ ছুটি (অঘোষিত লকডাউন) চলছে। এই সাধারণ ছুটিতে বন্ধ রয়েছে দেশের প্রায় সব ছোট-বড় কলকারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কর্মহীন হয়ে পড়েছে লক্ষ কোটি শ্রমিক কর্মচারী, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ।
আমরা জানি, আমাদের দেশের গার্মেন্ট, নির্মাণ, পরিবহন, পাট, বস্ত্র, সুতা, প্রবাসী শ্রমিক, চা, চামড়া, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, রাবার, স্টিল, রি-রোলিং, শিপব্রেকিং, চাতাল, রিকশা ও গৃহশ্রমিকসহ অসংখ্য প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরাই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু তারা আজ অসহায় এবং পরিবার-পরিজনসহ মানবেতর জীবন যাপন করছে।
সরকার ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো সেক্টরের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করলেও বেশির ভাগ শ্রমিকের জন্য কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি। ঘোষিত প্রণোদনা দিয়ে রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য বেতন-ভাতা প্রদানের নির্দেশনা দেওয়া হলেও অনেক মালিক কর্তৃপক্ষ এখনো শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন প্রদান করেনি। অনেক শিল্প-কারখানা লে অফ ও গার্মেন্ট ও ট্যানারিসহ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। অথচ সরকারের নির্দেশনা রয়েছে মহামারি চলাকালীন কোনো কারখানা লে অফ বা কোনো শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা যাবে না।
আবার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বকেয়া বেতনের দাবিতে রাজপথে বিক্ষোভ আন্দোলন করতে হচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। দেশব্যাপী সরকারের যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম তাও পর্যাপ্ত নয়। এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতকে উপেক্ষা করে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কোনো কোনো গার্মেন্টসহ অনেক কলকারখানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। কারণ শ্রমঘন এসব শিল্পে করোনাভাইরাস আরো ব্যাপক হারে ছডানোর আশঙ্কা রয়েছে। কতিপয় মুনাফালোভী মালিকের চাপে সরকারের এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত আরো ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।
শ্রমিকরাই যেহেতু দেশের অর্থনীতি ও শিল্প বিকাশের মূল চালিকাশক্তি সেহেতু শ্রমিকদের যদি অর্ধাহারে-অনাহারে রাখা হয়, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে দেশের শিল্পের চরম ক্ষতি হবে। তা ছাড়া মহামারি-পরবর্তী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এই শ্রমিকদের প্রস্তুত রাখা খুবই জরুরি।
পবিত্র ঈদুল ফিতর সমাগত। কিন্তু এখনো অনেক শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠানে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়নি। ঈদের আগে সব বকেয়াসহ মে মাসের বেতন ও বোনাস অবশ্যই প্রদান করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারেরও নির্দেশনা রয়েছে। না হলে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হবে, রাস্তায় নামবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই শিল্পের স্বার্থে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত এবং তাদের প্রাপ্য বেতন-ভাতা ও বোনাস যথাসময়ে পরিশোধে সরকার ও মালিক কর্তৃপক্ষকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র